Friday, September 24, 2010

কৃষিতে দরকার আধুনিক প্রযুক্তি

কৃষিতে দরকার আধুনিক প্রযুক্তি

গোটা বিশ্ব তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির জোয়ারে ভাসছে। উন্নত দেশগুলো প্রযুক্তির মাধ্যমে কৃষিতে ব্যাপক পরিবর্তন আনতে সক্ষম হয়েছে। বাংলাদেশ কৃষিপ্রধান দেশ হলেও এখানে লাগসই প্রযুক্তির তেমন ব্যবহার হচ্ছে না। অথচ প্রযুক্তি সুবিধাকে কাজে লাগিয়ে কৃষিতে কাঙ্ক্ষিত উন্নতি আনা সম্ভব। উন্নত বিশ্বে কৃষিতে ব্যবহারযোগ্য এসব প্রযুক্তি নিয়ে লিখেছেন—
সাদ আবদুল ওয়ালী

ই-কৃষি
ই-কৃষি হচ্ছে ইলেকট্রনিক মাধ্যমে যেমন রেডিও, টিভি, কম্পিউটার, ইন্টারনেট, মোবাইল, সিনেমা, সিডি, ডিভিডি ইত্যাদি কাজে লাগিয়ে কৃষকদের মাঝে কৃষি সংক্রান্ত সব তথ্যাবলী পৌঁছে দেয়া। আমাদের মতো দেশে কৃষকদের জ্ঞান সীমিত পর্যায়ে। সেক্ষেত্রে ইলেকট্রনিক মাধ্যমে কৃষকদের কাছে পর্যাপ্ত তথ্য সরবরাহ করা সহজ হবে। প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে এ মাধ্যমগুলো কৃষকদের তথ্য সরবরাহে সহায়তা প্রদান করবে। আমাদের কৃষকরা আধুনিক প্রযুক্তি জ্ঞানে শিক্ষিত হয়ে উঠবে।

কৃষিতে আধুনিক প্রযুক্তি
আমাদের দেশে যত বর্গ কিলোমিটার জায়গা রয়েছে ততটুকু জায়গার সদ্ব্যবহার করতে হবে। আধুনিক প্রযুক্তির সমন্বয়ের মাধ্যমে এ জায়গাগুলোকে উপযোগী করতে হবে উত্পাদনশীল ফসল সমৃদ্ধকরণে। উন্নত প্রজাতির উচ্চ ফলনশীল ধান কিংবা অন্যান্য ফসল উত্পাদনে প্রযুক্তিকে যথাযথভাবে কাজে লাগাতে হবে। এক্ষেত্রে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর কৃষি উপকরণ ব্যবহার করা প্রয়োজন। আমাদের দেশে কৃষি প্রযুক্তির উন্নয়ন জরুরি হয়ে পড়েছে। প্রযুক্তির যথাযথ ব্যবহারের ফলে আমাদের কৃষিতে যথেষ্ট পরিবর্তন সাধিত হবে। এখানে একটি উদাহরণ দেয়া যেতে পারে, যেমন কলের লাঙ্গলের ফলা ব্যবহারের মাধ্যমে উত্পাদন বাড়ানো সম্ভব হয়েছে। বিভিন্ন উন্নত দেশে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর কৃষি যন্ত্রপাতি আবিষ্কৃত হয়েছে। আমাদের দেশে সেসব আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর কৃষি যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে উত্পাদন বাড়ানোর কৌশল প্রয়োগ করতে হবে। অবশ্য এ প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। সমপ্রতি একটি তথ্যে জানা গেছে, দেশে তৈরি হচ্ছে আধুনিক কৃষি যন্ত্রপাতি।

আধুনিক কৃষি যন্ত্রপাতি
বিশ্বে বিভিন্ন ধরনের আধুনিক কৃষি যন্ত্রপাতি লক্ষ্য করা যায়। এ যন্ত্রপাতিগুলো উন্নত দেশের কৃষিতে পরিবর্তন আনতে যথেষ্ট ভূমিকা রেখেছে। বিশেষ করে চীনে কৃষিতে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। এখানে আধুনিক কৃষি ফার্ম বা খামার গড়ে উঠেছে। এক্ষেত্রে র্যাংকিংয়ে চীন প্রথম। প্রায় ৩০০ মিলিয়নের অধিক কৃষক কাজ করছেন অত্যন্ত সফলভাবে। যেসব কৃষি যন্ত্রপাতি কৃষি বিপ্লবে ভূমিকা রাখছে সেসব আধুনিক কৃষি যন্ত্রপাতিগুলো নিম্নে উল্লেখ করা হলো :
কম্বাইন হার্ভেস্টর : উন্নত দেশে কম্বাইন হার্ভেস্টর এমন এক ধরনের কৃষি যন্ত্র যা ফসল কাটা, আবর্জনা হতে ফসল দানা আলাদা করা ইত্যাদি কাজে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। আমেরিকা, জার্মান, চীনসহ প্রভৃতি উন্নত দেশে এ যন্ত্রের ব্যবহার লক্ষণীয়।
পাওয়ার টিলার : এটি একটি ট্রাক্টরের সহিত অতিরিক্ত সংযুক্ত যন্ত্র যা মাটিকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে গভীর থেকে আলগা করার মাধ্যমে চাষের উপযোগী করে। এটি আমেরিকা, দক্ষিণ আফ্রিকা, জার্মানি, ফ্রান্স, ইতালি, স্পেন, ব্রাজিল, মালয়েশিয়া, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, চীন, ভারত, বাংলাদেশ প্রভৃতি দেশে ব্যবহৃত হয়ে আসছে।
Plough : এক ধরনের কৃষি যন্ত্র যা মাটিকে বীজ বপনের উপযোগী করে প্রস্তুত করতে ব্যবহৃত হয়। এটি একটি প্রাথমিক টুল মাটিকে যথাযথভাবে সংমিশ্রণ করতে সহায়তা করে থাকে। এটি দক্ষিণ আফ্রিকাসহ বিভিন্ন দেশে ব্যবহৃত হচ্ছে। বর্তমানে এ টুলটি ট্রাক্টরের সহিত স্বয়ংক্রিয়ভাবে কাজ করে।
সাব সয়লার : এটি চষড়ঁময যন্ত্রের ন্যায় কাজ করলেও মাটিকে প্রায় ১২ ইঞ্চি গভীর হতে আলগা করে। এতে শক্ত ধারাল ব্লেড রয়েছে।
টু হুইল ট্রাক্টর : এটিও মাটিকে চাষাবাদের উপযোগী করতে বিশেষত বসতবাড়ির ভিটেতে কাজে আসে। এটি ইতালি, জার্মানি, আমেরিকা, জাপান, ভারত, বাংলাদেশসহ প্রভৃতি দেশে ব্যবহৃত হচ্ছে।
ব্রডকাস্ট সিডার : এটি সাধারণত বীজ বপন, সার দেয়া, কীটনাশক ছিটানো প্রভৃতি কাজে ব্যবহৃত হয়।
সিড ড্রিল : এ যন্ত্রটি ব্রডকাস্ট সিডার অপেক্ষা আধুনিক। এ যন্ত্রের সহায়তায় নির্দিষ্ট অবস্থানে বীজ বপন করা যায়।
এছাড়া আরও কিছু যন্ত্র যেমন মেনুয়র সেপ্রডার, সেপ্রয়ার, বিন হার্ভেস্টার, চেজার বিন, কর্ন হার্ভেস্টার, ইরিগেশন প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য।

কৃষিতে প্রযুক্তির প্রয়োগ
উন্নত দেশগুলো কৃষি ফসল উত্পাদনে ব্যবহৃত কৃষি যন্ত্রপাতি ডিজাইন করা হয়েছে বাস্তবতার ভিত্তিতে। যেমন বীজ বোনা, চাষাবাদ করা, চারা রোপণ, পোকামাকড় থেকে শস্যকে রক্ষা করা, মাঠ থেকে শস্য তোলা এবং শস্যের প্রক্রিয়াজাত প্রভৃতি ক্ষেত্রে প্রযুক্তির ব্যবহার লক্ষণীয়। প্রযুক্তির প্রয়োগে চীনে কৃষি ক্ষেত্রে ব্যাপক সাফল্য অর্জিত হয়েছে। আমরা প্রাথমিকভাবে সহজলভ্য দেশীয় প্রযুক্তি ব্যবহার করতে পারি। এর অংশ হিসেবে আমাদের দেশে দেশীয় প্রযুক্তি ব্যবহার করে পাওয়ার টিলার, পাওয়ার রিপার, ধান ও গম মাড়াই কল, ভেনটিরেটিং ড্রায়ার, ভুট্টা মাড়াই কল ইত্যাদি যন্ত্রপাতি তৈরি শুরু হয়েছে। এটি একটি ইতিবাচক দিক।

সাশ্রয়ী ও পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি
আমাদের দেশের জন্য চাই সাশ্রয়ী প্রযুক্তি। একটি উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে সাশ্রয়ী প্রযুক্তি আমাদের জন্য সহজে কার্যকর হয়ে ওঠবে এতে কোনো সন্দেহ নেই। এতে ঘর-গৃহস্থালী থেকে শুরু করে পানি ও স্যানিটেশন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, জ্বালানি শক্তি, কৃষি ও যন্ত্রপাতি, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা প্রভৃতি ক্ষেত্রে সাশ্রয়ী প্রযুক্তি ব্যবহার করা যেতে পারে।

বায়োগ্যাস প্রযুক্তি
এ প্রযুক্তি ক্ষুদ্র ও মাঝারি পরিসরে ব্যবহার করা যেতে পারে। বিশেষত গৃহস্থালী কাজের জন্য অর্থাত্ রান্না ও বৈদ্যুতিক কাজে বায়োগ্যাস প্রযুক্তি অনন্য। এ প্রযুক্তি অর্থনৈতিকভাবে অনেক সাশ্রয়ী অর্থাত্ কম খরচে অধিক লাভবান হওয়া যায়।

রি-সাইকেল প্রযুক্তি
রি-সাইকেল এমন একটি প্রযুক্তি যা পুনরায় ব্যবহার করা যায়। যেমন বায়োগ্যাস প্রযুক্তিতে পরিবেশের মারাত্মক কোনো বিরূপ প্রতিক্রিয়া আসে না। বরং এর সঙ্গে মাটির উর্বরতার বিষয়টি সম্পৃক্ত । অর্থাত্ রি-সাইকেল প্রযুক্তিতে এ ক্ষেত্রে জৈব সার উত্পাদন করা যায়।

সৌর বিদ্যুত্ প্রযুক্তি
সূর্যের আলো এ বিদ্যুত্ প্রযুক্তির একমাত্র উপাদান। এ প্রযুক্তি অনেক সাশ্রয়ী।

আর্সেনিকমুক্ত পানি প্রযুক্তি
এ প্রযুক্তির ক্ষেত্রে বাংলাদেশী বিজ্ঞানীর কৃতিত্ব উল্লেখ করার মতো, সারা বিশ্বে যা ব্যাপকভাবে আলোড়ন সৃষ্টি করে। সেই বিজ্ঞানীদ্বয় হচ্ছেন ডক্টর আবুল হুসসাম এবং ডক্টর আবুল মনির। বাংলাদেশের এ দু’জন বিজ্ঞানী পানিকে আর্সেনিকমুক্ত করার জন্য আবিষ্কার করেন সাশ্রয়ী সনো ফিল্টার।

খামারজাত সার তৈরি প্রযুক্তি
পশু-প্রাণীর বর্জ্য থেকে বিশেষত গোবর এই সারের মূল উপাদান। তবে তা সুষম করতে হয়।

আবর্জনা পচা সার প্রযুক্তি
প্রতিদিনের আবর্জনা থেকে একটি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সার উত্পাদন করা হয়।

কম্পোস্ট সার তৈরি প্রযুক্তি
আবর্জনা পচা সার ও এর উপাদান একই। তবে এর উপাদান স্তরে স্তরে সাজিয়ে একটি ভিন্ন প্রক্রিয়ায় এ সার তৈরি হয়।

আরও কিছু প্রযুক্তিগত সেবা...
যেসব প্রযুক্তিগত সেবা আমরা পেয়ে আসছি তা আমাদের জন্য সূচনা মাত্র। প্রয়োজন বিভিন্ন ধরনের প্রযুক্তিগত সেবার নিশ্চয়তা। আধুনিক প্রযুক্তির যথাযথ প্রয়োগ হওয়া বাঞ্ছনীয়। আর এসব প্রযুক্তিগত সেবাগুলো হচ্ছে :

কমিউনিটি বেতার
সরকার কমিউনিটি বেতার স্থাপনের জন্য লাইসেন্স প্রদান করেছেন। এ কমিউনিটি বেতার কৃষকদের প্রয়োজনীয় তথ্য প্রদানে সহায়তা করতে সক্ষম হবে। কৃষকদের মাঝে এটি অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

মুঠোফোনে সহায়তা
মোবাইল অপারেটরের মাধ্যমে মোবাইল ফোনে কৃষি সেবা কল কৃষকদের মাঝে প্রয়োজনীয় তথ্য সেবা প্রদান করবে। নির্দিষ্ট কল সেন্টারে সরাসরি ফোন দিয়ে জরুরি তথ্য জানা যাবে অনায়াসে। ইতিমধ্যে কৃষকরা এমনকি ক্ষেতে বসে এ সেবা পেয়ে আসছেন।

টিভিতে কৃষিবিষয়ক সমপ্রচার
অবশ্য টিভিতে কৃষিবিষয়ক বিভিন্ন অনুষ্ঠান সমপ্রচার হয়ে আসছে। এক্ষেত্রে চ্যানেল আইয়ের ভূমিকা অগ্রগণ্য। এছাড়া বিটিভি, বাংলাভিশনের নাম উল্লেখ করা সমীচীন। তবে কৃষিবিষয়ক অনুষ্ঠানের সংখ্যা অত্যন্ত সীমিত। এ ধরনের অনুষ্ঠানের সংখ্যা আরও ব্যাপকভাবে বাড়ানো প্রয়োজন। কৃষি সম্পর্কিত স্বতন্ত্র চ্যানেল করা যেতে পারে। কৃষিবিষয়ক সমপ্রচারগুলোর মাধ্যমে কৃষকরা জানতে পারবে প্রযুক্তিসমৃদ্ধ যাবতীয় তথ্য, খবরাখবর, নতুন নতুন প্রযুক্তির তথ্য।

ওয়েবসাইটে তথ্যসেবা
ওয়েব রিসোর্স একটি গুরুত্বপূর্ণ উত্স হতে পারে। অবশ্য কিছু কিছু কৃষিভিত্তিক ওয়েবসাইটে তথ্যসেবা পাওয়া যাচ্ছে। আরও ব্যাপকভাবে এ তথ্যসেবা দেয়া যেতে পারে, যাতে কৃষকরা তাত্ক্ষণিকভাবে তথ্য পেতে পারেন। এজন্য প্রয়োজন প্রত্যন্ত অঞ্চলে ইন্টারনেট সেবাসুলভ করা এবং সে সঙ্গে ১০০ ডলারের মতো কম বাজেটে ল্যাপটপ সহজলভ্য করা।
কৃষিনির্ভর দেশ হওয়া সত্ত্বেও আমরা কৃষিতে যথাযথ পরিবর্তন আনতে পারিনি। অবশ্য এর মূল কারণ আধুনিক প্রযুক্তিকে যথাযথভাবে ব্যবহার করতে না পারা। উন্নত দেশগুলোতে কৃষি ক্ষেত্রে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারের মাধ্যমে পরিবর্তন আনতে সক্ষম হয়েছে আশাতীতভাবে। আমাদের দেশে সরকারিভাবে কৃষি প্রযুক্তির বিকাশে সুদূরপ্রসারী উদ্যোগ নেয়া প্রয়োজন। যথাযথ উদ্যোগ ও পরিকল্পনায় কৃষি ক্ষেত্রে ঘটে যেতে পারে একটি নীরব বিপ্লব। কৃষির উন্নয়নে এদেশ সমৃদ্ধিশালী হবে একদিন।
walisearch@yahoo.com

আর্সেনিকোসিস সমাধানে প্রবাসী তরুণ বিজ্ঞানী : ড. কাদেরের নতুন উদ্ভাবন

আর্সেনিকোসিস সমাধানে প্রবাসী তরুণ বিজ্ঞানী : ড. কাদেরের নতুন উদ্ভাবন

আতাউর রহমান কাবুল
প্রায় সাড়ে ৮ কোটি লোক আর্সেনিক ঝুঁকির মুখে দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্য সমস্যার জন্য আর্সেনিককে বেশি দায়ী করা হচ্ছে। এর দীর্ঘস্থায়ী প্রতিক্রিয়ায় শরীরের চামড়া, ফুসফুস, কিডনি ও অন্যান্য মুল্যবান অংশে ক্যান্সারের মত কঠিন অসুখের সম্ভাবনা তৈরি করে। আর্সেনিক দূষনে বাংলাদেশের পরিস্থিতি ভয়াবহ। বাংলাদেশে প্রায় সাড়ে ৮ কোটি লোক আর্সেনিক ঝুঁকির মুখে। জানা গেছে, বর্তমানে মাত্র ১১টি জেলা আর্সেনিকমুক্ত। আর্সেনিকযুক্ত পানি পরিশোধিত করে ব্যবহার করা উত্তমপন্থা হলেও এসব প্রযুক্তি বেশ ব্যয়বহুল। আর্সেনিকে আক্রান্তের সংখ্যা দিনদিন বাড়লেও এখন পর্যন্ত অন্য কোন পন্থায় আর্সেনিকোসিস সমস্যার সমাধান সম্ভব হয়নি। তবে আশার কথা হলো— সমপ্রতি ভিয়োলা ভিটালিস, বার্কলি আমেরিকার এলিয়াম ভিটালিস এর সাথে যৌথভাবে আর্সেনিকোসিস সমস্যা সমাধানে নিউট্রাসিউটিক্যালস পণ্য উদ্ভাবন করেছে। যা আমেরিকার খাদ্য ও ওষুধ অধিদপ্তর (এফডিএ) কর্তৃক স্বীকৃতি পেয়েছে। এর আবিষ্কারক বাংলাদেশী তরুন বিজ্ঞানী ড.আব্দুল কাদের।
দীর্ঘ সাধনার ফল
সম্প্রতি আব্দুল কাদের বাংলাদেশে এসেছিলেন। তিনি জানালেন, ভিয়োলা ভিটালিস ও এলিয়াম ভিটালিস বিজ্ঞানকে কাজে লাগিয়ে উপযোগী নিউট্রাসিউটিক্যালস উদ্ভাবন করে আর্সেনিক সমস্যার সমাধান এনেছে। এটা তাদের দীর্ঘ সাধনার ফল যা নিউট্রাসিউটিক্যালস প্রাকৃতিক উপাদান থেকে তৈরি এবং যা প্রাণীদেহে পরীক্ষিত। তাদের উদ্ভাবিত ‘আর্সেনিকিওর’ (অত্ংবহরপঁত্ব) নামক লোশন শরীরের বাহ্যিক লক্ষণসমূহ দূর করে এবং অত্ং-ফবঃড়ী নামের ক্যাপসুল শরীরের ভেতরের আর্সেনিক দমন করে।
আবার ভিওলা ভিটালিস জার্মানির হেলমহোলস সেন্টার ফর এনভায়রনমেন্টাল রিসার্চ, লাইপযিগ এবং খুলনা প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে যৌথভাবে সুনিদৃষ্ট মাত্রার আর্সেনিক নির্নয়ের জন্য ‘বায়োসেন্সর’ উদ্ভাবন করেছে। স্বল্প খরচে ও স্বল্প সময়ে আর্সেনিকের মাত্রা পরীক্ষার জন্য এ বায়োসেন্সর অত্যন্ত উপযোগী বলে জানা গেছে।
প্রয়োজন সরকারী-বেসরকারী উদ্যোগ
চাঁদপুরের হাজী গঞ্জে প্রায় দুই শতাধিক আর্সেনিক আক্রান্ত মানুষের দেহে এটা প্রয়োগ করে যথেষ্ঠ ফল পাওয়া গেছে বলে জানা গেছে। তাদের উদ্যোগে ইতোমধ্যে আর্সেনিকে আক্রান্তদের মাঝে নিউট্রাসিউটিক্যালস সরবরাহ করতে বিভিন্ন বেইস ও স্যাটেলাইট ক্লিনিক স্থাপন করা হয়েছে। একটি বেইস ক্লিনিকের অধীনে ৫টি স্যাটেলাইট ক্লিনিক থাকবে এবং প্রতিটি ক্লিনিকে ৫০০ রোগীর স্বাস্থ্য সেবার ব্যবস্থা থাকছে। এসব স্যাটেলাইট ক্লিনিক ৩ থেকে ১২ মাস পর্যন্ত কার্যক্রম চালাবে। তবে সরকার কিংবা বেসরকারী উদ্যোক্তারা এগিয়ে এলে তিনি ব্যাপক কর্মসূচি গ্রহন করতে চান। ড. কাদের আশা করছেন এতে আর্সেনিক সমস্যার সমাধান আনা সম্ভব।
এ সংক্রান্ত সেমিনার
বাংলাদেশ একাডেমি অব সায়েন্স (বিএএস) এর উদ্যোগে গত শুক্রবার জাতীয় প্রেসক্লাবে আর্সেনিক সংক্রান্ত এক সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়। সেমিনারে উপস্থিত ছিলেন, বাংলাদেশ এটমিক এনার্জি কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান ও বাংলাদেশ একাডেমি অব সায়েন্স (বিএএস) এর সাধারন সমপাদক অধ্যাপক নঈম চৌধুরী, ভিয়োলা ভিটালিস এর প্রতিষ্ঠাতা তরুন বিজ্ঞানী ড. আবদুল কাদের, হেল্মহোল্টজ সেন্টার ফর ইনভায়রনমেন্টাল রিসার্চ জার্মানীর মিস. ক্যারোলা ইনডেস, প্রফেসর আমির হোসেন খান, ড. মেজবাহ উদ্দিন আহমেদ প্রমূখ।

স্বশিক্ষিত উদ্ভাবকদের উদ্ভাবন : ৫ : আজিজের সার ব্যবহার ফর্মুলা

স্বশিক্ষিত উদ্ভাবকদের উদ্ভাবন : ৫ : আজিজের সার ব্যবহার ফর্মুলা

এমরানা আহমেদ
টাঙ্গাইলের ঘাটাইল উপজেলার শালিয়াবহ গ্রামের আবদুল আজিজ। প্রচলিত পদ্ধতি বাদ দিয়ে তিনি পানিতে গুলিয়ে ইউরিয়া স্প্রে করে থাকেন। প্রচলিত ফর্মুলায় মাটিতে ইউরিয়া ছিটানো হয়। উদ্ভিদের শেকড় এই ইউরিয়া থেকে নাইট্রোজেন সংগ্রহ করে। অন্যদিকে আজিজের ফর্মুলা মোতাবেক উদ্ভিদের পাতায় পানিতে গোলানো ইউরিয়া স্প্রে করা হয়। পাতার অসংখ্য ছিদ্রের মাধ্যমে উদ্ভিদ এই ইউরিয়া থেকে নাইট্রোজেন সংগ্রহ করে। তার উদ্ভাবিত ইউরিয়া সার ব্যবহারের নতুন ফর্মুলা রীতিমত সাড়া ফেলে দিয়েছে। আবদুল আজিজ জানান, গত ১৫ বছর ধরে বিভিন্ন ফল-ফলাদির গাছে পানিতে গোলানো ইউরিয়া মিশিয়ে স্প্রে করে আসছেন। প্রচলিত ফর্মুলায় ৬০ শতাংশ আনারসের জমিতে যেখানে প্রয়োজন ৬ হাজার কেজি ইউরিয়া, সেখানে তার ফর্মুলায় ৬০ কেজিতেই মিটে যাচ্ছে। এভাবে উচ্চ ফলনশীল জাতের কুলের ক্ষেত্রে এক একর জমিতে যেখানে প্রায় ২০০০ কেজি ইউরিয়া প্রয়োগ করতে হয়, সেখানে এ পদ্ধতিতে মাত্র ২০ কেজি ইউরিয়া ব্যবহার করে কাঙ্ক্ষিত ফলন পাওয়া যাচ্ছে। একই প্রক্রিয়ায় ধানে ইউরিয়া স্প্রে করেও তিনি সফলতা পেয়েছেন। এক্ষেত্রে ২০ শতাংশ জমিতে তিন দফায় ৭৫০ গ্রাম ইউরিয়া প্রয়োগ করছেন। অর্থাত্ বিঘাপ্রতি ইউরিয়ার প্রয়োজন হচ্ছে মাত্র ১ কেজির কিছু বেশি। অথচ প্রচলিত পদ্ধতিতে কৃষক ১ বিঘা বোরো ধানের জমিতে ৪৫ থেকে ৫০ কেজি ইউরিয়া ছিটিয়ে থাকে। তার দেখাদেখি এলাকার অনেক কৃষক ফল গাছের পাশাপাশি ধান ক্ষেতেও ইউরিয়া স্প্রে করে প্রয়োগ করা শুরু করেছে। এভাবে আজিজের হাত ধরে এ পদ্ধতি ক্রমেই বিস্তৃত হচ্ছে। আব্দুল আজিজের অনুরোধে ব্রি’র গবেষণা প্লটে পরীক্ষামূলক গবেষণা করা হয়। সেখানেও ইতিবাচক ফল পাওয়া যায়। তিনি বোরো মৌসুমে কয়েকটি এলাকায় কৃষক পর্যায়ে এ পদ্ধতি প্রয়োগ করে ধান আবাদের উদ্যোগ নেয়। এক্ষেত্রে ফলাফল ইতিবাচক।

স্বশিক্ষিত উদ্ভাবকদের উদ্ভাবন : ৪ : সালাউদ্দিনের সৌরবিদ্যুত্

স্বশিক্ষিত উদ্ভাবকদের উদ্ভাবন : ৪ : সালাউদ্দিনের সৌরবিদ্যুত্

এমরানা আহমেদ
উদ্ভাবনের নেশায় বিভোর মোবাইল মেরামতের কারিগর ময়মনসিংহের স্থায়ী বাসিন্দা সালাহউদ্দিন আহমেদ একদিন স্টেডিয়াম মার্কেটের একটি দোকান থেকে ‘সোলার সেল’ কেনেন। ক্যালকুলেটরের যন্ত্রাংশের অনুকরণে ‘সোলার সেলটি’ সংযোজন করে সৌরবিদ্যুত্ উত্পাদন করে একটি বাল্ব জ্বালাতে সক্ষম হন। তবে সে সময় কিছুতেই একসঙ্গে দুটি বাল্ব জ্বালাতে পারেননি তিনি। পরে তার উদ্ভাবিত সৌরবিদ্যুিট বাচ্চাদের আলো জ্বালানোর খেলনা হয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু সালাউদ্দিন থেমে থাকেননি। চালিয়ে যান তার পরীক্ষা-নিরীক্ষা। এই পরীক্ষা-নিরীক্ষার ফসল হিসেবে দু’ সপ্তাহ পরে এটি ভিন্নভাবে সংযোজন করে ১২ ভোল্টের ব্যাটারির একটি বাল্ব জ্বালাতে সক্ষম হন স্বশিক্ষিত উদ্ভাবক সালাহউদ্দিন। এটি সূর্যের আলোতে জ্বলে। দীর্ঘ ৪ বছর ২০০৭ সালে তার উদ্ভাবিত প্রযুক্তি দিয়ে সৌরবিদ্যুত্ উত্পাদন প্লান্ট তৈরি করতে সক্ষম হন এবং ২০০৯ সালে তার এক শিল্পপতি বন্ধুর সহযোগিতায় প্রত্যন্ত জনপদ কুতুবদিয়ায় পরীক্ষামূলকভাবে একটি অতি ক্ষুদ্র সৌরবিদ্যুত্ স্থাপনা গড়ে তোলেন। গত ৫ মাস ধরে এ স্থাপনা থেকে বিদ্যুত্ উত্পাদিত হচ্ছে কোনো ধরনের সমস্যা ছাড়াই। এ স্থাপনার উত্পাদিত বিদ্যুত্ থেকে চলছে একটি এক ঘোড়া শক্তিসম্পন্ন ওয়াটার পাম্প, দশটি ৫৬ ইঞ্চির সিলিং ফ্যান, আঠারোটি ২৫ ওয়াট মানের এনার্জি বাল্ব, দুটি ২১ ইঞ্চি রঙিন টেলিভিশন।
উদ্ভাবক সালাউদ্দিন জানান, ছোটবেলায় স্বপ্ন দেখতেন ফ্লাইট ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার। কিন্তু দারিদ্র্যের কারণে মনের ভেতরকার লালিত স্বপ্ন অপূর্ণই থেকে যায়। মোবাইল ফোনের প্রসার লাভ করলে তিনি মোবাইল সার্ভিসিংকে পেশা হিসেবে বেছে নেন। আর এ অভিজ্ঞতা থেকেই তিনি মোবাইল ফোন সার্ভিসিংয়ের ওপর একটি বই লেখেন। স্টেডিয়াম মার্কেটের মোবাইল ফোন দোকানের সঙ্গে অংশীদারি চুক্তির ভিত্তিতে বইটি বাজারজাত করেন। এই দোকানেই একদিন তিনি সোলারসেল দেখতে পেয়ে তা বাসায় নিয়ে এসে পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর এই সৌরবিদ্যুত্ উদ্ভাবন করেন। সরকারের পৃষ্ঠপোষকতা পেলে এই সৌরবিদ্যুত্ নিয়ে তিনি আরও গবেষণা করতে পারবেন বলে জানান উদ্ভাবক সালাউদ্দিন।

Sunday, July 25, 2010

কোয়েল পালনে ভাগ্য বদল

কোয়েল পালনে ভাগ্য বদল

০০ ভ্রাম্যমাণ সংবাদদাতা

শখের বশে ৪ বছর আগে ৭শ' টাকা দিয়ে ১২টি কোয়েল পাখি কিনে পালন শুরু করেছিল যশোর জেলার চৌগাছা উপজেলার জাহাঙ্গীরপুর গ্রামের আব্দুল আল সামুন। তখন তার বয়স ছিল ১৬ বছর। এখন তার নিজের কোয়েল খামারে পাখির সংখ্যা ৩ হাজার। তার পরিচালনায় বিভিন্নস্থানে ৩০টি কোয়েল খামারে ৩০ হাজার পাখি পালন করা হচ্ছে। কোয়েল পালনে সামুন নিজের ভাগ্য বদল করেছে। পাশাপাশি অন্যের ভাগ্য বদলে সহায়তা করছে।

সামুন জানায়, যশোর থেকে ৭শ' টাকা দিয়ে দুটি পুরুষ ও ১০টি মেয়ে কোয়েল পাখি কিনে বাড়ি এনে পালন শুরু করে। পাখি ডিম পাড়া শুরু করলে বাড়ির মুরগীর ডিমের সাথে রেখে দিত। মুরগীর তাতে দিয়ে ডিম ফুটে বাচ্চা হত। একশ' টি বাচ্চা হয়। বাচ্চাগুলো বড় হলে প্রতি পিস ৯০ টাকা থেকে ১০০ টাকা করে বিক্রি করে দেয়। তার হাতে প্রায় ১০ হাজার টাকা জমে। এ টাকা দিয়ে ফের ৩শ' পিস বাচ্চা কিনে এনে গড়ে তোলে কোয়েল পাখির খামার। ডিম পাড়া শুরু করলে প্রতি পিস পাখি ৪০ টাকা করে বিক্রি করে। এরপর এক হাজার পিস বাচ্চা কিনে ৩০ দিন পালনের পর ১৫ টাকা পিস দরে বিক্রি করে। আস্তে আস্তে তার খামারের আয়তন বাড়াতে থাকে।

নিজে বুদ্ধি খাটিয়ে তৈরি করে ডিম ফুটানোর যন্ত্র। দ্রুত তার ভাগ্য বদল ঘটে। লাখপতি হয়ে যায়। তার বাড়িতে ৬টি শেড নির্মাণ করেছে। বর্তমানে তার কোয়েল খামারে ৩ হাজার পাখি আছে। প্রতিদিন দেড় হাজার ডিম হয়। এ ডিম ফুটিয়ে প্রতিদিন এক হাজার বাচ্চা উৎপাদন হচ্ছে। একদিন বয়সের বাচ্চা তার অধীনস্থ খামারিদের কাছে প্রতি পিস ৫ টাকা দরে বিক্রি করে দেয়। তারা ৩০ দিন পালন কর্।ে এরপর তাদের কাছ থেকে প্রতি পিস ২০ টাকা দরে কিনে ঢাকা, সিলেট, কুমিলস্না, খুলনা প্রভৃতি শহরে চালান পাঠায়। প্রতি পিস ২২ - ২৩ টাকা দরে বিক্রি হয়। সামুন জানায়, এক হাজার পিস কোয়েল একমাস পালতে ২শ' কেজি খাবার লাগে। ওষুধ ও অন্যান্য খরচ মিলিয়ে ১৩ হাজার টাকা ব্যয় হয়। এক হাজার পিস কোয়েল পালনে একজন খামারির মাসে ৭ হাজার টাকা লাভ থাকে। সামুনের খামারিরা মহেশপুর, কালীগঞ্জ, ঝিকরগাছা, বসুনদিয়া, যশোর প্রভৃতি স্থানের। বাচ্চা ৩০ দিন বয়স হলে তারা সামুনের বাড়িতে পৌঁছে দেয়। সামুন আরো জানায়, কোয়েল পাখি পালনে ঝুঁকি কম। কারণ কোয়েলের রোগব্যাধি কম হয়। বেশি পুঁজি খাটাতে লাগে না। আর পোল্ট্রি খামারের মত দুর্গন্ধ ছড়ায় না। এছাড়াও সে সোনালী লেয়ার মুরগি পালন করে। এর ডিম ফুটিয়ে বাচ্চা তৈরি করে বিক্রি করে থাকে। সে নিজে খামারে কাজ করে। দু'জন রাখাল রেখেছে তারা পাখি দেখাশুনার জন্য। খরচ বাদে সামুনের এখন মাসে ৪০ হাজার টাকা লাভ থাকে। লাভের টাকা সে খামার সমপ্রসারণে বিনিয়োগ করে। বর্তমানে তার মোট বিনিয়োগ ১২ লাখ টাকা। বিদু্যৎ না থাকলে জেনারেটরে বিদু্যৎ উৎপাদন করে। 
Source: Daily Ittefaq

Thursday, July 15, 2010

নার্সারি পদ্ধতিতে উত্পাদন : বগুড়ার শাজাহানপুরের সবজি চারা ছড়িয়ে পড়ছে সারাদেশে

নার্সারি পদ্ধতিতে উত্পাদন : বগুড়ার শাজাহানপুরের সবজি চারা ছড়িয়ে পড়ছে সারাদেশে

বগুড়া অফিস ও শাজাহানপুর প্রতিনিধি
নার্সারি পদ্ধতিতে উচ্চ ফলনশীল জাতের সবজি চারা উত্পাদন করে বগুড়ার শাজাহানপুরের কৃষকরা নিজেদের অর্থনৈতিক পরিবর্তন ঘটিয়েছেন। বর্তমানে তাদের উত্পাদিত চারা স্থানীয় বাজারের চাহিদা মিটিয়ে বিক্রি করছে পঞ্চগড়, নাটোর, সিরাজগঞ্জ, পাবনা, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর, সাভার, জামালপুর, মানিকগঞ্জ, সিডরকবলিত এলাকা মঠবাড়িয়াসহ দেশের বিভিন্ন এলাকার কৃষকদের কাছে। এখানকার উত্পাদিত চারার মধ্যে সিম, বরবটি, ঝিঙ্গা, বেগুন, চিচিঙ্গা, লাউ, টমেটো, বাঁধাকপি, ফুলকপি, শাক, মুলা, চালকুমড়া, পেঁপে, পটল, করল্লা উল্লেখযোগ্য। শাজাহানপুরের মাদলা, খোট্টাপাড়া, চোপীনগর, আমরুল ও আড়িয়া ইউনিয়নের কৃষকরা ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছে নার্সারিতে। ওইসব অঞ্চল এনসিডিপি প্রকল্পভুক্ত করা হয়েছে। ইতোমধ্যে কোনো কোনো নার্সারিতে কয়েক দফা চারা উত্পাদন ও বিক্রি হয়েছে। নার্সারির একপাশে চলছে বেড তৈরি অন্য পাশে চলছে চারা উত্তোলন।
উচ্চ ফলনশীল জাতের সুস্থ-সবল সবজি চারা উত্পাদনে খ্যাতি অর্জনকারী উপজেলার দুবলাগাড়ী হাটের জিতু বীজ ভাণ্ডার অ্যান্ড নার্সারিতে দেখা গেছে চারা ক্রেতাদের উপচেপড়া ভিড়। চারার বয়স, আকার ও সবলতার দিক বিবেচনায় প্রতি হাজার মরিচের চারা ৪শ’ থেকে ৮শ’ টাকায়, কপির চারা ৩শ’ থেকে ৫শ’ টাকায়, এবং টমেটোর চারা ৪শ’ থেকে ৮শ’ টাকায় বেচা-কেনা হচ্ছে। জিতু বীজ ভাণ্ডারের স্বত্বাধিকারী জিল্লুর রহমান বলেন, হাইব্রিড জাতের সবজি চারার চাহিদা বেড়েছে। ২০/২২টি নার্সারিও চারা সরবরাহে হিমশিম খাচ্ছে। অপরদিকে চারা প্রাপ্তির আশায় ক্রেতারা ১০/১৫ দিন আগেই চারা বুকিং দিয়ে যাচ্ছেন। গত বছর তিনি ২০ লাখ মরিচ, ৯ লাখ কপি, দেড় লাখ টমেটো এবং ২ লাখ বেগুনের চারা বিক্রি করেছেন। আবহাওয়া ভালো থাকলে চলতি বছর চারা উত্পাদন ও বিক্রি দু’টোই বাড়বে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেছেন।
শ্রাবণ, ভাদ্র ও আশ্বিন—এ তিন মাস ব্যবসা চলে পুরোদমে। কার্তিক ও অগ্রহায়ণে চারা উত্পাদন এবং বিক্রির কাজ অনেকটাই কমে যায়। তখন সীমিত পর্যায়ে চারা তৈরির পাশাপাশি নার্সারির জমিতে নিজেও সবজির চাষ করেন। এভাবে সারা বছরই এখানকার কৃষকরা জড়িয়ে থাকেন সবজি উত্পাদনের সঙ্গে।
চোপিনগর গ্রামের কৃষক আশরাফ আলী বলেন, হাইব্রিড জাতের ১ কেজি টমেটোর বীজের দাম প্রায় ৬০ হাজার টাকা, ১ কেজি মরিচের বীজের দাম ৩০-৩৫ হাজার টাকা। তাই চারা উত্পাদনে অনভিজ্ঞ সাধারণ কৃষকরা বীজ থেকে চারা উত্পাদনের ঝুঁকি নেয় না। বরং চারা কিনে চাষাবাদ করাই ভালো।
দুবলাগাড়ী রাস্তা দিয়ে মোটা কাগজের কার্টুনে কিছু একটা নিয়ে যাচ্ছিলেন মোজাম্মেল হক (৪০)। তার বাড়ি জামালপুর জেলার মাদারগঞ্জ উপজেলার মির্জাপুর গ্রামে। কার্টুনের দিকে ইশারা করতেই তিনি বললেন, তাতে আছে বিজলী হাইব্রিড মরিচের চারা। আর এ চারা নিতেই তিনি যমুনা ও বাঙ্গালী নদী পাড়ি দিয়ে দুবলাগাড়ী গ্রামে এসেছিলেন। হাইব্রিড জাতের মরিচ আবাদ করে প্রতিবেশী ফজলু মিয়া কয়েক বছর ধরে বেশ পয়সা কামিয়েছেন। তার মতো মুনাফা পাওয়ার আশায় শাহ্ নগর থেকে তিনি সংগ্রহ করলেন হাইব্রিড মরিচের চারা। সবজি নার্সারি ও সবজি চাষে কর্মসংস্থান হয়েছে কয়েকশ’ নারী ও পুরুষ শ্রমিকের। এলাকার আবাদযোগ্য জমিগুলো চলে এসেছে নিবিড় চাষাবাদের আওতায়। একটানা ২ সপ্তাহের বেশি কোনো জমি পড়ে থাকে না। জমিতে একটার পর একটা ফসল থাকছেই। উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা রফিকুল ইসলাম বলেন, এই অঞ্চল সবজি ও চারা উত্পাদনে ব্যাপক ভূমিকা রাখায় দুবলাগাড়ীহাট এনসিডিপি গ্রোয়ার্স মার্কেট ভবন নির্মাণ করা হয়েছে।
এখানে বার মাসই চলে উত্পাদনের কাজ। এখানকার উত্পাদিত সিম, বরবটি, ঝিঙ্গা, বেগুন, চিচিঙ্গা, ধনিয়া পাতা, রাঁধুনী পাতা, লাউ, মুলা, গাজর, টমেটো, বাঁধাকপি, ফুলকপি, লালশাক, পালংশাক, মুলা, চালকুমড়া, পেঁপে, পটল, করল্লা, স্থানীয় বাজারের চাহিদা মিটিয়ে রাজধানী শহর ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলার বাজারেও পৌঁছে যায়। আর এখানেই লুকিয়ে আছে অসচ্ছল কৃষকদের স্বনির্ভরতার কাহিনী।
Source: Daily Amardesh

কুষ্টিয়ায় মোটাতাজা করা হচ্ছে একশ’ কোটি টাকার গরু

কুষ্টিয়ায় মোটাতাজা করা হচ্ছে একশ’ কোটি টাকার গরু

সিরাজ প্রামাণিক, খোকসা
বৃহত্তর কুষ্টিয়ায় ৬টি উপজেলায় কৃষকদের গোয়ালে-গোয়ালে কোরবানির পশুর হাটগুলোতে বিক্রির জন্য অর্ধ লক্ষাধিক গরু মোটাতাজা করা হয়েছে। টাকার অংকে এগুলোর মূল্য হবে প্রায় একশ’ কোটি টাকা। এছাড়াও ৭-৮টি খামারেও কোরবানির বাজার ধরার জন্য গরু মোটাতাজা করা হয়েছে।
খোকসার এক্তারপুর গ্রামের শাহাদাত আলীর ফার্মে ৫টি গরু মোটাতাজাকরণ করা হচ্ছে। আশার এক্তারপুর শাখার ম্যানেজারের পরামর্শ ও অর্থ ঋণ সহায়তায় এ গরুগুলো কিনে আধুনিক সুবিধাসংবলিত খামার গড়ে তুলেছেন। আর এখন এসব নাদুস-নুদুস চোখ জুড়ানো গরুগুলো বিক্রির পালা। এদেশে আগেও বাড়িতে বাড়িতে কোরবানির গরু পালন করা হতো। তবে তার সংখ্যা খুব বেশি ছিল না। ভারত থেকে চোরাচালানে গরু আসা শুরু হলে এলাকায় দেশীয় গরু মোটাতাজাকরণ ব্যবসা একেবারে কমে যায়। ২০০০ সালের পর থেকে কৃষকরা নতুন করে স্থানীয় এনজিওগুলোর অর্থঋণ সহায়তায় বাণিজ্যিকভাবে কোরবানির বাজার ধরতে গরু মোটাতাজাকরণ ব্যবসা শুরু করে। কুষ্টিয়ার পার্শ্ববর্তী চুয়াডাঙ্গা জেলার আলমডাঙ্গা উপজেলার গ্রামে প্রথম এ ব্যবসা শুরু হয়। এরপর পার্শ্ববর্তী এলাকাগুলোতে দ্রুত প্রসার ঘটে। বর্তমানে কুষ্টিয়া জেলার মিরপুর, ভেড়ামারা, দৌলতপুর, কুষ্টিয়া সদর, কুমারখালী ও খোকসা উপজেলায় বাণিজ্যিকভাবে গরু মোটাতাজাকরণ প্রকল্প চলছে কৃষকদের গোয়ালে গোয়ালে।
কুষ্টিয়া জেলার পশু সম্পদ কর্মকর্তা জানান, এ জেলায় এ বছরে ২০ হাজার কৃষক গোয়ালে গোয়ালে ৪৭ হাজার গরু কোরবানির হাটগুলোতে বিক্রির জন্য মোটাতাজা করা হয়েছে। কেউ একটি, দুটি আবার কেউ ৭-৮টি খামারেও গরু মোটাতাজা করেছে। কুষ্টিয়া জেলার টাকিমারা, বরিয়া, হরিনারায়ণপুর, বৃত্তিপাড়া, আব্দালপুর, খাজানগর, দুর্বাচারা, কমলাপুর, লাহিনী, পাহাড়পুর, বাগুলাট, চাপড়া, বাঁশগ্রাম, পান্টি, জোতমোড়া, মোড়াগাছা, এক্তারপুর, আমবাড়িয়া, গোপগ্রাম প্রভৃতি গ্রামে বেশিসংখ্যক গরু মোটাতাজাকরণ হয়ে থাকে। এসব গ্রামের হতাশাগ্রস্ত প্রায় ৫ শতাধিক কৃষক স্থানীয় একটি এনজিওর অর্থঋণ সহায়তায় গরু মোটাতাজাকরণ খামার গড়ে তুলে সুখের নিঃশ্বাস ছাড়ছে।
মাঝারি ও বড় সাইজের গরুর প্রধান বাজার হচ্ছে ঢাকার গাবতলীর হাট। এছাড়াও এ অঞ্চলের বালেপাড়া, আলমডাঙ্গা, উজানগ্রাম, হরিনারায়ণপুর, পান্টি, মুন্সিগঞ্জ, বদরগঞ্জ, মিরপুর, ভাটই, শৈলকুপা, ডুগডুগি, বাঁশগ্রাম, গাংনীসহ বিভিন্ন পশুর হাটে কোরবানির ঈদের আগে এসব মোটাতাজা গরু তোলা হয়। ব্যাপারীরা হাট থেকে এসব গরু কিনে ঢাকা, চট্টগ্রাম, ফরিদপুরের টেপাখোলা, বরিশাল, সিলেট ইত্যাদি স্থানে ট্রাকযোগে চালান নিয়ে যায়। আবার ব্যাপারীরা গৃহস্থের বাড়ি থেকেও গরু কিনে ঈদের আগে চালান নিয়ে যায়। বড় চাষী নিজেও ট্রাকে করে গাবতলীর হাটে চালান নিয়ে যায়।
কুমারখালী উপজেলার পান্টি গ্রামের মোঃ আমানুল্লাহ রাজা জানান, তিনি ৩ বছর ধরে কোরবানির পশুর হাটে বিক্রির জন্য গরু মোটাতাজাকরণ ব্যবসা করছেন। ১৫ থেকে ৩০ হাজার টাকা দিয়ে ২টি ফ্রিজিয়ান ও তিনটি শাহীওয়াল ও নেপালি জাতের বাছুর কিনে এক বছর ধরে পালছেন। ১৫-১৬ মণ মাংস হবে এমন দুটি গরু ১ লাখ ২৫ হাজার টাকা দাম দিয়েছে ব্যাপারীরা। নেপালি জাতের একেকটির দাম ৬০ থেকে ৬৫ হাজার টাকা করে উঠছে। তিনি বলেন, ভারতীয় গরু না এলে এবার চড়া দামে বিক্রি করতে পারবেন। তার পাঁচটি গরু এক বছর পালন করতে ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা ব্যয় হয়েছে। তিনি জানান, গো-খাদ্যের দাম চড়ে যাওয়ায় গরু মোটাতাজাকরণে ব্যয় অনেক বেড়ে গেছে। চালের খুদ প্রতি কেজি ২৩ টাকা, ছোলা ৩৫ টাকা কেজি, খৈল ২৭ টাকা, ধানের বিচালি এক আঁটির দাম ১১ টাকা থেকে ১২ টাকা। গরুপিছু বছরে খাদ্য বাবদ ৩০ থেকে ৩২ হাজার টাকা ব্যয় হয়। আর বড় সাইজের একটি গরুর পেছনে প্রতিদিন ২শ’ টাকা ব্যয় হচ্ছে। কৃষকরা জানান, কোরবানির তিনমাস আগ থেকে গরুর খাবারের পরিমাণ বাড়িয়ে দেয়া হয়। এতে গরু তেজী ও দেখতে সুন্দর হয়। কুষ্টিয়ার সীমান্তবর্তী জেলা ঝিনাইদহের শৈলকুপা উপজেলায় সাতগাছি গ্রামে ওসমানের খামারে ৮৯টি ষাঁড় মোটাতাজা করা হয়েছে। পাবনার সাথিয়া থেকে বাছুর কিনে এক বছর ধরে মোটাতাজা করা হচ্ছে। খামারের তত্ত্বাবধায়ক ইসরাইল হোসেন জানান, গরু প্রতি ব্যয় হচ্ছে ৩০ টাকা থেকে ৩২ হাজার টাকা। এবার বাজার ভালো বলে তিনি জানান। গত বছর কোরবানির আগে বাজার পড়ে যাওয়ায় অনেক চাষী গরু বিক্রিতে লোকসান দেয়। খোকসার পাইকপাড়ার গ্রামের হাসিনা বেগমও খামার করে সংসারে সুখ-সচ্ছলতা ফিরে পেয়েছেন। স্থানীয় একটি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা থেকে ১ম পর্যায়ে ১০ হাজার টাকার ঋণ নিয়ে বাছুর কিনে শুরু করে পালন। এরপর তাকে আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। বর্তমানে হাসিনার খামারে গরুর সংখ্যা ৫টি। কয়েক বছর আগেও কোরবানির পশুর হাটগুলোতে ভারতীর গরুর আধিক্য ছিল। বর্তমানে দৃশ্যপট বদলে গেছে। বর্তমানে এদেশের চোখ ধাঁধানো গরুতে হাটগুলো ভরপুর। ক্রেতারাও এসব গরু কিনতে আগ্রহী। ভারত থেকে আসা বুুড়ো গরুর মাংস স্বাদে কম। দেখতে ভালো না বলে ব্যাপারীরা জানান।