Showing posts with label COTTAGE IND. TECH. NEWS. Show all posts
Showing posts with label COTTAGE IND. TECH. NEWS. Show all posts

Monday, September 26, 2011

নকশি কাঁথা এখন যাচ্ছে বিদেশেও

নকশি কাঁথা এখন যাচ্ছে বিদেশেও

লেখক: জামালপুর প্রতিনিধি | মঙ্গল, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০১১, ১২ আশ্বিন ১৪১৮

Details

জামালপুরের গ্রামীণ নারীদের নিপুণ হাতে তৈরি নকশি কাঁথা এখন দেশের গন্ডি পেরিয়ে ভারত, নেপাল, শ্রীলঙ্কা, ইউরোপ-আমেরিকাসহ বিশ্বের উন্নত দেশগুলোতে যাচ্ছে। গ্রামবাংলার ঐতিহ্যের এই নকশি কাঁথা এখন সম্ভাবনার নতুন দ্বার উন্মোচন করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের রূপ নিয়েছে। গাঁয়ের বধূরা এখন ঘরে বসে নেই তারা এখন নকশি কাঁথা বাণিজ্যিকভাবে তৈরি করছেন।

জামালপুর জেলা সদরসহ বিভিন্ন উপজেলায় এলাকার দরিদ্র, মধ্যবিত্ত এমনকি শিক্ষিত মহিলারা পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছেন কারুশিল্পকে। মহিলাদের আত্মকর্মসংস্থানের লক্ষ্যে ব্যবসায়িক দৃষ্টিভঙ্গিতে সীমিত আকারে আশির দশকে এ কারুশিল্প শুরু হয়। বর্তমানে এর চাহিদা বৃদ্ধি পেয়ে এ ব্যবসার চিত্র পুরোপুরি পাল্টে গেছে। কারুশিল্পকে ঘিরে জামালপুর জেলায় সৃষ্টি হয়েছে ছোট-বড় ৩ শতাধিক নারী উদ্যোক্তা, যার মাধ্যমে ঘরে বসে থাকা ৬০ হাজারের বেশি নারী তাদের কর্মসংস্থানের সুযোগ করে নিয়েছেন। কারুশিল্পকে ঘিরে এখন জেলার আনাচে-কানাচে জমজমাট ব্যবসা চলছে। রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলার মহাজনরা কারুশিল্পী ও উদ্যোক্তাদের কাছে বিভিন্ন ডিজাইনের বিছানার চাদর, নকশি কাঁথা, ওয়ালম্যাট, সোফার কুশন, পাপোশ, ফতুয়া, নকশি করা রকমারি পাঞ্জাবি মহিলাদের হ্যান্ডব্যাগসহ নানা পোশাকের অর্ডার নিয়ে থাকেন।

ঈদ পূজা পার্বণে রকমারি ডিজাইনের পোশাক সারা দেশে বিক্রি হয়ে থাকে। পাইকারী বিক্রির পাশাপাশি রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশ থেকে আগত ক্রেতারা নিজেদের পছন্দের পোশাক স্বল্প মূল্যে ক্রয় করে থাকেন। পূজা ও সামনে ঈদের কেনাকাটা শুরু হয়ে গেছে। জামালপুরের কারুশিল্পের উন্নয়নে এবং নারী উদ্যোক্তাদের আর্থিক সচ্ছলতার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আতিউর রহমানের নির্দেশে ন্যাশনাল ব্যাংক সমপ্রতি ঋণ প্রদান প্রক্রিয়া চালু করেছে । ইতিমধ্যে অনেক উদ্যোক্তা মোটা অঙ্কের ঋণ নিয়ে তাদের ব্যবসার প্রসার ঘটিয়েছেন।

শহরের আমলাপাড়ার পরশমনি হস্তশিল্প, রকি হস্তশিল্প, সৃষ্টি হস্তশিল্পসহ বাংলার উত্সব হস্তশিল্পের মালিকগণ অভিযোগ করে বলেন, স্থানীয় ন্যাশনাল ব্যাংক কর্তৃপক্ষের নিকট প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দিয়েও দীর্ঘদিন যাবত্ ঋণ না পেয়ে তাদের ব্যবসার তেমন প্রসার ঘটাতে পারেননি। এব্যাপারে ব্যাংক ব্যবস্থাপকের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি জানান, যোগ্য ব্যক্তিদের ঋণদান অব্যাহত রয়েছে। নারী উদ্যোক্তারা জানান, কারু ও কুটির শিল্পের প্রতি সরকারে বিশেষ নজর দিয়ে ঋণ প্রদান অব্যাহত থাকলে মোটা অঙ্কের পুঁজি বিনিয়োগের মাধ্যমে ঘরে বসেই এখন দেশ-বিদেশে ব্যবসা চালিয়ে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা সম্ভব। পাশাপাশি গ্রামীণ বেকার মহিলারা তাদের ঘরে বসে কর্মক্ষম হয়ে নিজে এবং দেশকে স্বাবলম্বী করে তুলবেন। বর্তমানে জামালপুরে ঘরে বসে ব্যবসা পরিচালনা করার সুযোগ সৃষ্টি হওয়ায় জেলার অনেক কর্মমুখী নারী/পুরুষ ব্যবসা প্রসার ঘটিয়ে এখন নিজেরা স্বাবলম্বী হয়েছেন।

শহরের কাচারিপাড়ার কারু নিলয়, হ্যান্ডিক্র্যাফটের মালিক আঞ্জুমান আরা খানম ১৫০০ টাকা পুঁজি নিয়ে ১৯৯৫ সালে নিজ বাসায় নকশি কাঁথার কাজ শুরু করেন। এখন তার ১০ জন কর্মচারি ও ৭০০ সেলাই কর্মী রয়েছে। ন্যাশনাল ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়েছেন ৫ লাখ টাকা। বর্তমানে মোট মূলধন দাঁড়িয়েছে ১৫ লাখ টাকা। এ ছাড়া দীপ্ত কুঠির, শতদল, রংধনু, প্রত্যয়, প্রতীক হ্যান্ডিক্র্যাফটের মালিকসহ অনেকেই আজ প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী। এ শিল্পের সঙ্গে জড়িতরা জানান, মোবাইল ফোনের মাধ্যমে ঘরে বসেই ব্যবসা পরিচালনা করতে পারেন তারা। জনপ্রিয় শিল্পটি উন্নয়নে সরকারি সহযোগিতা পেলে পোশাক শিল্পের ন্যায় এ শিল্পটি প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করতে পারবে বলে মনে করছেন উদ্যোক্তারা।

Source: Daily Ittefaq

Related Link:

বিশ্ব বাজারে বগুড়ার নকশি কাঁথা

Thursday, January 27, 2011

সাফল্য : মূলধনবিহীন চেতারার হস্তশিল্প


সাফল্য : মূলধনবিহীন চেতারার হস্তশিল্প
রহিমা আক্তার

জগতের যা কিছু শ্রেষ্ঠ অর্জন তা সম্ভব হয়েছে প্রতিভার কল্যাণে। নারীরা তাদের বুদ্ধি ও আত্মবিশ্বাস দিয়ে সমাজে তাদের অবস্থান তৈরিতে সক্ষম হয়েছেন। বর্তমান পুরুষতান্ত্রিক সমাজে নারীকে চার দেয়ালের মাঝে আবদ্ধ করে তাদের ছোট করে রাখা হচ্ছে। সভ্যতার চরম উত্কর্ষের কালেও নারী তার সাধারণ মানবিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। যে কোনো সভ্য সমাজে নারীর অবস্থান অত্যন্ত তাত্পর্যপূর্ণ। আজ শুধু গৃহ সংরক্ষণ ও সন্তান পরিচর্যাই নারীদের একমাত্র দায়িত্ব নয়। তারা পুরুষের মতো সৃষ্টিশীল ও উন্নয়নমূলক কাজ করতে সক্ষম। নারীরা তাদের বুদ্ধি আর আত্মবিশ্বাস দিয়ে তৈরি করছে অনেক অভাবনীয় জিনিসপত্র। আজকের এই নারীর দক্ষতার মধ্যে রয়েছে আলাদা এক বৈচিত্র্য।চেতারা বেগম নোয়াখালীর গ্রামের এক গৃহবধূ, সংসার জীবনে প্রবেশের পর থেকেই ছোটখাটো কুটির শিল্পের কাজ করতেন। এতে করে নিজের পারিবারিক জিনিসগুলোর চাহিদা মিটত এবং তার হাতে কিছু নগদ টাকা আসত। তার শিল্পের সঙ্গে ছিল নকশি শীতলপাটি, হাতপাখা (বাঁশের, কাপড়ের)। চার সন্তানের জননী চেতারা বেগম সন্তানদের দায়িত্ব পালনের অবসরে এসব কাজ করতেন। গ্রামের দৃশ্য গাছপালা ও ফুলের নকশা করতেন শীতলপাটি ও হাতপাখার মাঝে। গ্রাম ছেড়ে শহরে এসে বন্ধ হয়ে যায় তার কুটির শিল্পের কাজ। অবসর সময় তাকে কুঁড়ে কুঁড়ে খেত। সময়কে কাজে লাগানোর জন্য ব্যস্ত হয়ে ওঠেন তিনি। তখনি একদিন টিভির একটা অনুষ্ঠানে শুনতে পান, কাগজকে ভাতের মাড়ের সঙ্গে ভিজিয়ে রাখলে তাতে মণ্ড তৈরি হয়। এই কৌশলটা তিনি আয়ত্ত করেন। প্রথমে ছোট ছোট বাটি-ঝাঁকা তৈরি করেন। ২/১টা জিনিস তৈরি করার পর আগ্রহ বেড়ে যায়। এরপর আস্তে আস্তে তিনি কীভাবে কী তৈরি করা যায় তার কৌশল খুঁজতে থাকেন। আমাদের গৃহের ব্যবহারের উপযোগী কিছু আসবাবপত্র তৈরি করতে চেষ্টা করেন। রান্নাঘরের সবজি ও শুকনো জিনিস রাখার জন্য এই মণ্ড দিয়ে রেক তৈরি করেন। পানির ফিলটার রাখার স্ট্যান্ড তৈরি করেন। ফুলদানি ও বড় বড় ঝাঁকা তৈরি করার সঙ্গে সঙ্গে ভাবেন কীভাবে আরও নতুন নতুন আসবাবপত্র তৈরি করা যায়। একে একে তিনি চেয়ার-টেবিল বানানোর উদ্যোগ নেন এবং সেভাবে ট্রি টেবিল-চেয়ার, টিভির ট্রলি, চাল রাখার বক্স, ট্রাঙ্ক ধরনের বক্স ইত্যাদি তৈরি করেন। বসার জন্য বিভিন্ন আকারের মোড়া বানান। এগুলো শুধু শো-পিস হিসেবে নয়, আমাদের কাঠের তৈরি আসবাবপত্রের মতো ব্যবহারও করা হয়। চেতারা বেগম জানান, গ্রামে গৃহবধূ থাকাকালে কাজের ফাঁকে বাঁশ, বেত ও সুতার কাজ করতে ভালো লাগত। গ্রামের মেয়েদের বিয়ের সময় এগুলোর প্রয়োজন হতো। তখন ওরা এগুলো কিনতে আসত। তখন শিতলপাটি, নামাজের বিছানা, কাপড়ের হাতপাখার খুব কদর ছিল। সর্বপ্রথম ১ জোড়া কাপড়ের নকশা করা হাতপাখা ২০ টাকায় বিক্রি করি। শেষের দিকে এক জোড়া ১২০ টাকাও বিক্রি করেছি। নিখুঁত কাজের ওপর দাম দেয়া হতো। সন্তানদের সুন্দর ভবিষ্যতের আশায় গ্রাম ছেড়ে শহরে আসি। শহরের সাংসারিক কাজ শেষে অবসর সময় কাটানো যায় না। বই পড়া আর টিভি দেখা ছাড়া কোনো কাজ নেই। শহরের বৈদ্যুতিক পাখার জায়গায় হাতপাখার খুব একটা প্রয়োজন হতো না। তারপরও নিজের ব্যবহারের জন্য তৈরি করেছি। একদিন টিভিতে পেপার ও ভাতের মাড়ের সাহায্যে শো-পিস তৈরির কথা শুনি। এরপর এটাকে কাজে লাগাই। প্রথমে ছোট কিছু তৈরি করতে পারাতে আগ্রহ বাড়ে। জিনিসগুলো দেখতে ভালো এবং মজবুত হয়। কীভাবে মণ্ড তৈরি করেন জানতে চাইলে বলেন, ভাতের মাড়ের মাঝে দুই দিন পেপার বা অপ্রয়োজনীয় কাগজগুলো ভিজিয়ে রাখি। দুই দিন পর এগুলোকে চিপে শিলের (পাটার শিল) সাহায্যে থেঁতলে নরম করে আটার মতো করি। এরপর ইচ্ছামত ডিজাইন করি মাটির তৈরি জিনিসগুলোর মতো। মাটির তৈরি জিনিসগুলো ভেঙে যায়, কিন্তু এগুলোকে হাতের সাহায্যে টিপে টিপে শক্ত করে রোদে শুকালে অনেক মজবুত হয়। যত বেশি রোদে দেয়া যায়, এগুলো শুকিয়ে তত হালকা হয়। তবে বড় কিছু তৈরি করতে বেশি কাগজের প্রয়োজন হয় বলে মাঝে মাঝে ভেতরে ছোট ছোট জর্দার কৌটা ব্যবহার করেছি। শুকিয়ে এলে ভাতের মাড়ের সাহায্যে সাদা কাগজ লাগিয়ে তার ওপর বিভিন্ন রং দিয়ে ডিজাইন করে থাকি। এই কাগজের তৈরি আসবাবপত্র আমি দৈনন্দিন কাজে ব্যবহার করছি। চেয়ার-টেবিলে দাঁড়ানো বা বসা যায়, মোড়াগুলো যে কোনো কাজে ব্যবহার করা যায়। এগুলোকে একমাত্র পানি থেকে দূরে রাখতে হয়। আসল কথা হলো, এই কাজে কোনো টাকার প্রয়োজন হয় না। শুধু শারীরিক পরিশ্রম ও ফেলে দেয়া জিনিস দিয়ে এগুলো তৈরি করা সম্ভব। এই শিল্প জনপ্রিয়তা পাবে। নিখুঁত হাতে তৈরি করলে এর মাধ্যমে নতুনত্বের ছোঁয়া আসতে পারে।চেতারা বেগম আরও বলেন, এখনও আমাদের দেশে অনেক নারী-পুরুষ আছেন যারা পুঁজির অভাবে কাজ খুঁজে পান না। তবে ধৈর্য ও নিখুঁত হাতের ব্যবহার করলে কাগজের তৈরি এই শিল্প জনপ্রিয় হয়ে উঠতে পারে। কাঠ, বেত ও স্টিলের আসবাবপত্রের সঙ্গে এই শিল্প একদিন ভালো একটা জায়গা দখল করবে, এটাই প্রত্যাশা চেতারা বেগমের।

Sunday, January 2, 2011

বিদেশে যাচ্ছে মুন্সীগঞ্জের পাতক্ষীর

বিদেশে যাচ্ছে মুন্সীগঞ্জের পাতক্ষীর মোহাম্মদ সেলিম, মুন্সীগঞ্জতেঁতুলের কথা শুনলেই যেমন যে কারোরই জিভে পানি এসে যায়। তেমনি মুন্সীগঞ্জ তথা বিক্রমপুরের পাতক্ষীর-এর সাধ যারা নিয়েছেন নিশ্চয়ই তাদেরও তেমন অনুভব হবে। তাই তো শুধু গাভীর দুধ দিয়ে তৈরি এ সুস্বাদু খাবারের চাহিদা সুদূর ইউরোপেও। শতাব্দীর প্রসিদ্ধ এই খাবারের জনপ্রিয়তাও বাড়ছে দেশ-বিদেশে। একমাত্র মুন্সীগঞ্জ জেলার সিরাজদিখান উপজেলার সন্তোষপুর গ্রামেই তৈরি হয় বিশেষ এই মুখরোচক খাবার। ঐতিহ্যবাহী নানা উৎসবে এ ক্ষীরের উপস্থিতি না থাকলে যেন অসম্পূর্ণ থাকে সে উৎসব। প্রতিদিন কয়েক মন দুধ ব্যবহার হচ্ছে এ ক্ষীর তৈরিতে। সব মৌসুমেই এর চাহিদা থাকলেও শীতে চাহিদা অনেক বেশি। বাঙালি ঐতিহ্যের পাটিসাপ্টা পিঠা তৈরিতেও প্রয়োজন হয় পাতক্ষীরের। নতুন জামাইর সামনে পিঠাপুলির সঙ্গে এই এ ক্ষীর ব্যবহার না করা যেন বেমানান। গ্রাম বাংলায় মুড়ির সঙ্গেও এ ক্ষীর খাওয়ার পুরনো রীতি রয়েছে।সন্তোষ গ্রামের সাতটি পরিবার এখন এই ক্ষীর তৈরির সঙ্গে জড়িত। তবে পুলিনবিহারী দেবই প্রথম স্ত্রীকে নিয়ে ক্ষীর তৈরি করে বিক্রি করতেন বলে তার উত্তরসূরিরা জানান। সেও শত বছর আগের কথা। এছাড়া ইন্দ্র মোহন ঘোষ, লক্ষ্মী রানী ঘোষও তৈরি করতেন এই ক্ষীর। তারা সবাই বর্তমানে প্রয়াত। এখন তাদের বংশধররাই এই পেশা ধরে রেখেছেন। কার্তিক চন্দ্র ঘোষ, ভারতী ঘোষ, সুনীল চন্দ্র ঘোষ, রমেশ শ্যাম ঘোষ, বিনয় ঘোষ, মধুসূদন ঘোষ, সমির ঘোষ ও ধনা ঘোষ এ পেশায় বর্তমানে রয়েছেন। তবে সুনীল ঘোষের ৫ ভাই এ পেশায়। ক্ষীর তৈরিতে পারদর্শী পারুল ঘোষ বলেন, প্রতিটি পাতক্ষীর তৈরিতে ৩ কেজি দুধ প্রয়োজন হয়। আধা ঘণ্টার বেশি সময় ধরে জাল দিতে হয় এ দুধ। দুধের সঙ্গে সামান্য প্রায় ৫০ গ্রাম চিনি ব্যবহার করা ছাড়া আর কিছুই ব্যবহার হয় না এ ক্ষীর তৈরিতে। তবে ডায়াবেটিক রোগীর জন্য বিশেষ অর্ডার থাকলে চিনি দেয়া হয় না। তারপর যখন দুধ ঘন হয়, তখন মাটির দই-এর পাতিলের মতো বিশেষ পাতিলে রাখা হয় ক্ষীর। ঘণ্টাখানেক পর ঠাণ্ডা হলে তা কলাপাতায় পেঁচিয়ে বিক্রয়যোগ্য করা হয়। তবে হাতের যশ ও কৌশল ক্ষীর তৈরিতে কাজে লাগাতে হয়। ঘন করতে গেলে চুলোয় দুধে পোড়া লেগে যায়। তাই কাঠের বিশেষ লাঠি দিয়ে নাড়তে হয় দুধ অনবরত। আর 'পাতা' নিয়েই এর নামকরণ। হ্যাঁ, তৈরি সম্পন্ন হওয়ার পর এ ক্ষীর কলাপাতায় জড়িয়ে থাকে বলেই ক্ষীরের নাম হয়েছে পাতক্ষীর, বললেন ভারত ঘোষ। শুধু সুনীল ঘোষের বাড়িতেই প্রতিদিন এ ক্ষীর তৈরি হয় ৫০টিরও বেশি। প্রতিটি ক্ষীরের ওজন প্রায় আধা কেজি। প্রতি পাতক্ষীরের মূল্য ১০০ থেকে ১২০ টাকা। বাজারে দুধের দাম বেড়ে গেলে বেড়ে যায় ক্ষীরের দামও। ঘরের বউরা এ ক্ষীর তৈরিতে কষ্ট করেন বেশি। হাড়ভাঙা পরিশ্রমের পর তৈরি হয় এই ক্ষীর। তবে প্রতিটিতে কিন্তু সব কিছুকেই টপকিয়ে পাতক্ষীর ঐতিহ্য আর ব্যতিক্রমের দিক থেকে সবচেয়ে বড় একটি জায়গা দখল করে আছে।
Source: Daily Bangladesh Pratidin 19th may 2010

Saturday, December 4, 2010

রাঙ্গামাটিতে মাশরুম দারিদ্র্য বিমোচনে অবদান রাখছে

রাঙ্গামাটিতে মাশরুম দারিদ্র্য বিমোচনে অবদান রাখছে

মাশরুম পুষ্টি ও ঔষধিগুণে ভরা একটি সবজি। মাশরুম উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, কোষ্ঠকাঠিন্য ও জণ্ডিসসহ বিভিন্ন রোগের মহৌষধ হিসেবে কাজ করে। মাশরুমকে আগে অনেকে 'ব্যাঙের ছাতা' বলে জানতো। কিন্ত ব্যাঙের ছাতা আর মাশরুম এক জিনিস নয়। মাশরুম তৈরি হয় আধুনিক টিসু্যকালচার পদ্ধতিতে। স্বয়ংসম্পূর্ণ একটি ল্যাবরেটরিতে যে কোনো মাশরুমের একটি থেকে এক টুকরো মাশরুম সংগ্রহ করে, টেস্টটিউবে ভরে টিসু্যকালচারের মাধ্যমে মাশরুমের বীজ উৎপন্ন করা হয়। কাঠের গুঁড়ো, আখের ছোবা, খড় কিংবা ফেলনা কৃষি বর্জ্য দিয়ে মিকচার মেশিনে এর সঙ্গে চুন ও গমের ভুসি মিশিয়ে তৈরি করা হয় বীজ বা স্পন প্যাকেট। এরপর বীজ প্যাকেটগুলোকে জীবাণুমুক্ত করতে অটোক্লেভ মেশিনে ১২০ ডিগ্রি তাপমাত্রায় প্রায় একঘণ্টা রাখা হয়। ল্যাবরেটরিতে উৎপাদিত বীজ ক্লিনবেঞ্চের মাধ্যমে এই স্পন প্যাকেটে দেয়া হয়।

রাঙ্গামাটিতে বাণিজ্যিকভাবে মাশরুম চাষ শুরু হয়েছে। মাশরুম চাষ করে রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলায় অনেক উপজাতীয় নারী-পুরুষ স্বাবলম্বী হয়েছে। স্বল্প খরচে মাশরুম চাষ ব্যাপক লাভজনক হওয়ায় মাশরুম চাষ রাঙ্গামাটিতে জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। খাদ্য হিসেবে মাশরুমের উপকারিতা সম্পর্কে সাধারণ লোকজনের মাঝে ধারণা হওয়ায় দিন দিন এর চাহিদাও বাড়ছে। পাহাড়ে বসবাসরত উপজাতি জনগোষ্ঠীদের আগে থেকেই মাশরুম একটি জনপ্রিয় খাদ্য। এ কারণে উপজাতিরা মাশরুম চাষে অধিক আগ্রহী। রাঙ্গামাটি জেলার আসাম বস্তি এলাকা, মনোঘর এলাকা, তবলছড়িসহ অসংখ্য এলাকায় উপজাতি বাঙালিরা বাণিজ্যিকভাবে মাশরুম চাষ শুরু করেছেন। তবে মাশরুম চাষে উপজাতিরা বেশি আগ্রহী হয়ে উঠছে। আগের পাহাড়িরা সবজি হিসেবে পরিবারের জন্য চাষ করলেও স্বল্প খরচে অধিক লাভ হওয়ায় বর্তমানে মাশরুম বাণিজ্যিকভাবে চাষ শুরু করেছে। পাহাড়ি অনেক পরিবার জুম চাষের পরিবর্তে ঘরের মধ্যেই মাশরুম চাষ শুরু করেছে। মাশরুম দিয়ে নানা ধরনের নাশতা তৈরি, তরকারি হিসেবে ও বিভিন্নভাবে এটি খাওয়া যায়।

মাশরুম চাষে বেশি পরিশ্রম করা লাগে না। মাশরুম চাষ স্বল্প খরচে অতি দ্রুত অধিক লাভবান হওয়া যায়। একটি স্পন (বীজ) থেকে ২৫০-৩০০ গ্রাম পর্যন্ত মাশরুম উৎপাদন করা সম্ভব। প্রতি কেজি মাশরুম বিক্রি হয় ১২০-১৪০ টাকায়। তাই বাজারে এর চাহিদাও বেশি। দারিদ্র্য বিমোচনে মাশরুম রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলায় কার্যকর ভূমিকা পালন করে চলছে। মাশরুম বিক্রি করে মাসে তিন থেকে বারো হাজার টাকা পর্যন্ত আয় করা সম্ভব। সঁ্যাতসেঁতে পরিবেশে ঘরের বাড়তি স্থানে ওয়েস্টার মাশরুম চাষ করা কঠিন কিছু নয়। স্পন বা বীজ কিনে প্যাকেটের গায়ে ধারালো বেস্নড বা চাকু দিয়ে 'ডি' আকৃতিতে কেটে আদর্্রতা ভেদে ৩-৪ বার পানি দিয়ে পরিচর্যা করলেই মাশরুম পাওয়া সম্ভব। মাশরুম চাষে বড় জায়গার প্রয়োজন হয় না। মাশরুম চাষকে আরো সমপ্রসারণ করে মানুষের দোরগোড়ায় পেঁৗছে দেয়া গেলে দারিদ্র্য বিমোচনের একটি বড় হাতিয়ার হিসেবে কাজ করবে।
মো. শফিকুর রহমান, বনরূপা, রাঙ্গামাটি সদর, রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলা।

Friday, December 3, 2010

মসলিনের ইতিকথা

মসলিনের ইতিকথা

সৈ য় দ লু ত্ ফু ল হ ক
খ্রিস্টপূর্ব ২০০ বছর আগে গ্রিকরা ভারতীয় কার্পাসের কথা বলেছে। স্ট্যাটিটিয়াস (Statitius) কার্পাস তুলাকে ‘কবোসম’ বলেছেন। জে ফর্বেস রয়েল (J Forbes Rayle, M.D, F.R.S) তাঁর গ্রন্থ 'The Early History of Cotton' গ্রন্থে লিখেছেন। গ্রিকরা ঢাকার মসলিনকে ‘গ্যাঞ্জোটিকা’ নামে উল্লেখ করেছেন। যেহেতু বস্তুটি গঙ্গা উপকূলে তৈরি হতো। বাংলাদেশী বস্ত্র শিল্পীর এই মসলিন শিল্প জগদ্বিখ্যাত। বিখ্যাত গ্রিক পর্যটক প্লিনি থেকে শুরু করে ডা. উরে (Dr. Ure) এবং টেইলর পর্যন্ত বিখ্যাত ব্যক্তিরা মসলিন সম্পর্কে বহু লেখায় ভূয়সী প্রশংসা করেছেন।
প্লিনির সময়ে মসলিনের নাম ছিল ‘কার্পাসিয়াম’, যদিও এই শব্দটি সংস্কৃত ভাষার কার্পাস শব্দের অপভ্রংশ। অতীতকালে ঢাকার আশপাশে ভাওয়াল রাজার অধীনে কাপাসিয়া প্রধান কেন্দ্র ছিল। ‘কার্পাসিয়াম’ শব্দ থেকে ‘কাপাসিয়া’ অঞ্চলের নামকরণ করা হয়েছে। খ্রিস্ট ধর্মীয় গ্রন্থে (বাইবেল) এই মসলিনের উল্লেখ পাওয়া যায়। (ইজেফিল, ১৪শ অধ্যায় এবং ইলিয়ায় ১০, ১৩ ও তৃতীয় অধ্যায়ে) প্লিনি লিখেছেন, রোমে রাজপ্রাসাদের মেয়েরা মসলিন বস্ত্র পরিধান করিয়া স্বীয় নগ্ন অবয়ব সাধারণ মানুষের কাছে উপস্থাপন করত। (A dress under whose slight veil our women continue to show their shapes to the public.)
ডাক্তার উরে বলেছেন, ‘রোমের স্বর্ণযুগে ঢাকার মসলিন রোমের রাজ মহিলাদের সবচেয়ে প্রিয় এবং বিলাস বসন হিসেবে আদৃত ছিল (cotton manufacturer of Great Britain by Dr. Ure) কবি ইয়েটস লিখেছেন, বঙ্গদেশের কার্পাস খ্রিস্টপূর্ব দুইশত বছর পূর্বে গ্রিক দেশে প্রচলিত ছিল।
জুভিনেলের পুস্তকেও মসলিনের ভূয়সী প্রশংসা করা হয়েছে। প্লিনির লেখাতে পাওয়া যায়, বাংলাদেশের ঢাকা নগরী মসলিনের সর্বশ্রেষ্ঠ কেন্দ্রবিন্দু ছিল। সুপ্রাচীন কাল থেকে ঢাকাই মসলিনের সুখ্যাতি প্রতিষ্ঠিত। চীন, তুরস্ক, সিরিয়া, আরব, ইথিওপিয়া, পারস্য ও স্পেনে এই মসলিনের বাণিজ্য প্রচলিত ছিল। সিল্ক রোড, নৌপথে, মধ্য এশিয়া থেকে ইউরোপ-অবধি এই মসলিনের বাণিজ্য প্রচলিত ছিল। বঙ্গদেশ থেকে আরব বণিকেরা পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে মসলিন রফতানি করেছে। প্রবাদ আছে, তদানীন্তন স্পেনের রানী ইসাবেলার অত্যন্ত প্রিয় ছিল এই মসলিন। বঙ্গদেশের এই মসলিন যেত তাঁর কাছে। তা ছাড়া প্রভেন্স, ইতালি লেংগুইডকে ঢাকার মসলিন প্রেরিত হতো।
মিসরের রাজা এন্টোনিও (ক্লিওপেট্রার নন্দিতপ্রেমিক) তাঁর সৈন্যদের ‘কার্বাসাম’ বস্ত্র উপহার দিয়েছিলেন। ট্রেভারনিয়ার লিখেছেন, মুহাম্মদ আলী বেগ ভারত বর্ষ থেকে ফিরে রাজা চাসেফিকে মূল্যবান প্রস্তরখচিত ডিম্বাকৃতির একটি নারিকেল উপহার দেন। তার মধ্যে ৬০ হাত দীর্ঘ একটি মসলিন কাপড় ছিল। কাপড়টি এতই পাতলা ছিল যে, হাতে রাখলে কোনো কিছু আছে বলে মনে হতো না।
খ্রিস্টীয় দ্বিতীয় শতাব্দীর শেষভাগে ‘এরিয়ান’ ঢাকার মসলিনের উল্লেখ করেছেন (Periplus of the Erythrean sea) দুই চীনদেশীয় পর্যটক নবম শতাব্দীতে ভারতবর্ষের বিবরণীতে একটি পুস্তক লিখেছেন (Account of India and China by Two Mohammadan Travellers) নূরজাহানের মাতার এই উপহারে জাহাঙ্গীরের অহমিকায় ছেদ পড়ে যায়। প্রতিদানে জাহাঙ্গীর তাঁর শাশুড়িকে কিছু উপহার দেয়ার প্রস্তাব করেন। শাশুড়ি তেমনি এক পেয়ালা মসলিন দিলেই চলবে বলে জানিয়ে দেন। জাহাঙ্গীর মসলিন সংগ্রহের জন্য ২২০০ অশ্বারোহী সৈন্য বঙ্গদেশের উদ্দেশে প্রেরণ করেন। বঙ্গদেশের উদ্দেশে দীর্ঘ পথ অতিক্রম করতে পথিমধ্যে দুই-তৃতীয়াংশ সৈন্যের প্রাণহানি ঘটে। পানিতে ডুবে, ম্যালেরিয়া, দস্যুর আক্রমণ ইত্যাদি কারণে। কিন্তু ওইসব সৈন্যরা ছোট্ট একটি পেয়ালা পূর্ণ করার মতো মসলিন সংগ্রহ না করে দিল্লি দরবারে ফিরে যায়। এই সামান্য মসলিন দিল্লির সম্রাট শাশুড়িকে উপহার দিয়েছিলেন। শাশুড়ি অত্যন্ত খুশি হয়েছিলেন; কিন্তু সম্রাট অপূর্ণ কাপটির বেদনা সারাজীবন বইতে হয়েছে। সম্রাট জাহাঙ্গীরের স্ত্রী নূরজাহানের কাছে মসলিন অত্যন্ত প্রিয় ছিল। মোগল সম্রাটরা মসলিনের প্রতি এত ঈর্ষান্বিত ছিলেন যে মসলিনের প্রচার ও বিদেশ পাঠানো বন্ধ করে দিয়েছিলেন। নূরজাহানের সুরুচির কারণে ভারতের সব নগরীতে মসলিন একটি বিশেষ স্থান দখল করেছিল।
মসলিনের সুতা সাধারণত মেয়েরা তৈরি করত এবং এটি মেয়েদের কাজ হিসেবে গণ্য করা হতো। পুরুষরা সুতা কাটাকে অপমানজনক মনে করত। যেসব সৈন্য বা রাজা যুদ্ধে পরাজিত হতেন, তাদের অপমান করার জন্য সুতা কাটতে দেয়া হতো। বাংলার সুতো কাটার ওপর বৈষ্ণব সঙ্গীত প্রচলিত গানটি ছিল এরূপ—
“(সে হাটে) বিকায় নাতো অন্য সুতা
বিনা তাঁতি নন্দের সুত
সে হাটের প্রধান তাঁতি, প্রজাপতি পশুপতি,
আর যত আছে তাঁতি-তাদের শুধু যাতাযাতি\”
মসলিনে সূক্ষ্ম সুতা কাটার জন্য তরুণী মেয়েদের ব্যবহার করা হতো, কারণ তাদের দৃষ্টিশক্তি ও হাতের সাহায্যে সূক্ষ্মতা অনুভূত হতো। বয়স বাড়লে অনুভূতিগুলো নষ্ট হয়ে যায়। 'India of Ancient and Middle Age' গ্রন্থে মিসেস ম্যানিং লিখেছেন, ঘাসের ওপর বিছানো একখানি সুদীর্ঘ মসলিন একটি গাভী খেয়ে ফেলেছিল। যার জন্য গাভীর মালিক দণ্ডিত হয়েছিল। ঐতিহাসিক কাফি খাঁ মোগল অন্তঃপুরে মসলিনের কদরের কথা লিখেছেন। বস্ত্র শিল্পের ইতিহাসে মসলিন সর্বশ্রেষ্ঠ বলে প্রমাণিত হয়েছে। ১৮৬১ খ্রিস্টাব্দে ঢাকায় মাত্র একটি ঘর তাঁতি মসলিন বয়ন করতে পারত, তা পরবর্তী সময়ে বিলীন হয়ে যায়। ১৭৭৬ খ্রিস্টাব্দে একখানি মসলিন ৬০ পাউন্ডে বিক্রি হতো। তার দৈর্ঘ্য ছিল বিশ গজ, ওজন ছিল সাড়ে সাত আউন্স। সম্রাট জাহাঙ্গীরের আমলে একখানি মসলিন ৪০০ পাউন্ডে বিক্রি হতো। টপোগ্রাফি অব ঢাকায় ১৬০ হাত লম্বা একখানি মসলিনের ওজন ছিল চার তোলা। এই মসলিন সোনারগাঁয়ে ১৮০০ খ্রিস্টাব্দে তৈরি হয়েছিল।
ব্রহ্মপুত্র, পদ্মা ও মেঘনার মিলনস্থলে ১৯৬০ বর্গমাইল জুড়ে পৃথিবীর সর্বোত্কৃষ্ট মসলিন তৈরি হতো। এর কেন্দ্রস্থল ছিল ‘কাপাসিয়া’। তাছাড়া ঢাকা, মুড়াপাড়া, সোনারগাঁ, ডেমরা, তিতবর্দী, বালিয়াপাড়া, নপাড়া, মৈকুলী, বাহারক, চরপাড়া, বালটেক, নবীগঞ্জ, সাহাপুর ও সামরাই প্রভৃতি স্থানে মসলিন উত্পন্ন হতো। ১৮০০ খ্রিস্টাব্দে মসলিনের অবনতির দিনেও ঢাকায় ৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা, সোনারগাঁয়ে ৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা, ডেমরায় ২ লাখ ৫০ হাজার টাকা, তিতবর্দীতে ১ লাখ ৫০ হাজার টাকার মসলিন রফতানি বা বিক্রি হয়েছিল। ১৭৫৩ খ্রিস্টাব্দে ২৮ লাখ ৫০ হাজার টাকার বস্ত্র বিক্রি হয়েছিল। ১৭৮৩ খ্রিস্টাব্দে ৫০ লাখ টাকার মসলিন বিদেশে রফতানি হয়েছিল।
ইংরেজ শাসনামলে যান্ত্রিক পদ্ধতিতে কাপড় প্রস্তুত করে ঢাকার মসলিনের সঙ্গে পাল্লা দেয়া সম্ভব হচ্ছিল না। ওয়াটসন সাহেব লিখেছেন 'With all our machines and wonderful Intentions we have neither to been unable to produce a fabric which for fineness or utility can equal the woven air of Dacca.' আমাদের বস্ত্রের নানাবিধ অত্যাশ্চর্য উপায়গুলো থাকা সত্ত্বেও চারুশিল্প হিসেবে মসলিনের ঐন্দ্রজালিক সক্ষমতার সঙ্গে পাল্লা দিতে পারিনি। ১৮০০ খ্রিস্টাব্দে ইংরেজ সরকার ঢাকার মসলিন উত্পাদন ও বিক্রি নিষিদ্ধ করে এবং ব্রিটিশদের তৈরি কাপড় রফতানি শুরু করে। ফলে মসলিন উত্পাদন ক্রমে ক্রমে বিলোপ হতে থাকে। তাছাড়া মসলিন প্রস্তুতকারী তাঁতি ও সুতা তৈরির কারিগরদের ওপর নানা প্রকার নির্যাতন শুরু করা হয়। এমনকি মসলিন তৈরির সূক্ষ্ম কারিগরদের আঙুল কেটে দেয়া হয়।
বঙ্গদেশের গোটা প্রদেশে এই বস্ত্র তৈরি হতো। এর বাণিজ্যের প্রধান স্থান ছিল ঢাকা, সুবর্ণগ্রাম, ডেমরা, তিতবর্দী, জঙ্গলবাড়ি ও বাজিতপুর। প্রাচীনকাল থেকে পৃথিবীর সুসভ্য দেশ থেকে এসব অঞ্চলে বণিকদের আগমন ঘটেছিল।
বর্তমান প্রজন্মের কাছে মসলিন একটি নাম এবং ইতিহাস বিশ্বখ্যাত এই মসলিন আমার ঐতিহ্যের সম্পদ। সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম এই মসলিন হয়তো আমরা আর তৈরি করতে পারব না। যদিও বর্তমানে কিছু মসলিন তৈরি হচ্ছে, যা আগেকার তুলনায় অত্যন্ত স্থূল। আসুন, সবাই মিলে গৌরবোজ্জ্বল মসলিনের গৌরব ফিরিয়ে আনি।
গ্রন্থসূত্র
১. চীনের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস
২. বৃহত্ বঙ্গ, ড. দীনেশচন্দ্র সেন
৩. প্রাচীন আরবের ইতিহাস ও বেদুঈন পোশাক, আরব সরকার প্রকাশিত

Thursday, December 2, 2010

বিশ্ব বাজারে বগুড়ার নকশি কাঁথা

বিশ্ব বাজারে বগুড়ার নকশি কাঁথা
০০আমিনুল ইসলাম চৌধুরী,বগুড়া অফিস

বগুড়ার পলস্নীবধূদের নিপুণ হাতে তৈরী হস্তশিল্প বিশ্ব বাজারে স্থান করে নিয়েছে। তৈরী হচ্ছে নকশি কাঁথা, বুটিক, টেবিল ক্লথ, বস্নক প্রিন্টিং উলেন শাল, কুশন, তাল_ খেজুরের পাতা ও শ্বাস থেকে তৈরী ব্যাগ, বাস্কেট। এ শিল্পে কাজের সুযোগ পেয়ে বগুড়া শহর, শহরতলি ও গ্রামের দরিদ্র ও হতদরিদ্র দেড় শতাধিক পলস্নীবধূ স্বাবলম্বী হয়েছে। গৃহকর্মের ফাঁকে বাড়তি আয়ের সুযোগ পেয়েছে। বগুড়া শহরের বেসরকারি সংস্থা (এনজিও) পলস্নী উন্নয়ন প্রকল্পের অধীনে গ্রামের দরিদ্র ও হতদরিদ্র মহিলাদের সংগঠিত করে প্রায় দশ বছর আগে এ প্রকল্পটি শুরু করেছে। এ সময়ের মধ্যে প্রকল্পের আওতায় মহিলাদের সুচি শিল্প থেকে হস্ত শিল্পের প্রশিক্ষণ দিয়েছে। প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত মহিলারা এখন ডিজাইন তৈরীতেও পারদর্শী। নিপুণ হাতে তৈরী নকশি কাঁথা, কুশন, নকশি করা শাল, তাল খেজুরের পাতা ও শ্বাস থেকে তৈরী বাস্কেট, ব্যাগ, টেবিল ল্যাম্প ক্রয় করে বাজারজাত করছে পলস্নী উন্নয়ন প্রকল্প (পাপ)। বিদেশের বাজারেও এসব হস্ত ও সুচি শিল্পের নমুনা তুলে ধরেছে পাপ। তিন/ চার বছরের ব্যবধানে পাপ ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের ইংল্যান্ড, জার্মান, ইতালি ও নরওয়ে রপ্তানিযোগ্য পণ্যের তালিকায় যুক্ত করতে সক্ষম হয়েছে। স্বীকৃতি পেয়েছে ওয়ার্ল্ড ফেয়ার ট্রেড সংস্থা ( ডবিস্নউএফটিও), এশিয়া ফেয়ার ট্রেড ফোরাম (এএফটিএফ ও ইকোটা ফেয়ার ট্রেড ফোরামের ( ইএফটিএফ)। বিশ্ব বাজার ধরতে পাপ এসব শিল্প মেলায় অংশগ্রহণ করে এখানকার দরিদ্র-হতদরিদ্র মহিলাদের তৈরী হস্ত ও সুচি শিল্পের সুনাম ও চাহিদা তৈর করতে সক্ষম হয়েছে। এখন বিদেশীরাই বগুড়ার গ্রামের মহিলাদের সাথে চুক্তি করছে। ডিজাইন করে দিচ্ছে।

সংস্থার প্রধান সমন্বয়ক শেখ আবু হাসানাত সাঈদ জানিয়েছেন, গত অর্থবছরে ২৫ লাখ টাকার পলস্নী মহিলাদের তৈরী ১০টি শিল্পকর্ম রপ্তানি করা হয়েছে। এ বছর আরো ৩০ লাখ টাকার চাহিদাপত্র পাওয়া গেছে। বগুড়া শহর, শহরতলি ও গ্রামগুলো হচ্ছে লতিফপুর কলোনী, বেজোড়া, নন্দগ্রাম, জামপাড়া, দেঘলকান্দি, মাঝগ্রাম, নিশ্চিন্তপুর উলেস্নখযোগ্য। গ্রামের প্রায় প্রতিটি ঘরের মহিলারা অবসরে বা গৃহকর্মের ফাঁকে সুচি শিল্পকর্মে ব্যস্ত। দেঘলকান্দি গ্রামের দরিদ্র পরিবারের গৃহবধূ বেবী বেগম, সাজেদা বেগমের সংসারে একদিন অভাব অনটন লেগেই থাকত। সমাজে ছিলেন অনাঙ্ক্ষিত। ছিল না মর্যাদা। পলস্নী উন্নয়ন প্রকল্পের (পাপ) সাথে যুক্ত হয়ে ও প্রশিক্ষণ নিয়ে এখন সে একজন উপার্জনক্ষম নারী। সমাজেও মর্যাদা পাচ্ছেন। বেবী বেগমের মত সাজেদা, পাপিয়ারাও আজ সুচি ও হস্তশিল্প থেকে ভাগ্যের পরিবর্তন ঘটিয়েছে। বগুড়া শহরের চকলোকমান এলাকায় পাপের অফিসে গিয়ে দেখা হল দুজন বিদেশিনী এনা ও ইউত্তার সাথে। একজন এসেছেন লন্ডন থেকে, অপরজন এসেছেন নরওয়ে থেকে বগুড়ার মহিলাদের তৈরী নকশিকাঁথা, কুশন, পাটের ব্যাগ ও পরিবেশ বান্ধব তাল ও খেজুর পাতা ও শ্বাস থেকে তৈরী হস্তশিল্প পরিদর্শনে। নিজের দেশের জন্য অর্ডার নিয়ে যাবেন। এনা ও ইউত্তার জানালেন, এখানকার হস্তশিল্প তাদের দেশে যথেষ্ট চাহিদা আছে। এ দুজন বিদেশিনী এবার ৫ লাখ টাকা মূল্যের হস্তশিল্পের অর্ডার দিয়েছেন।
Source: Daily Ittefaq

Tuesday, October 12, 2010

পিঠা ঐতিহ্যই নয় একমুঠো অন্নও জোগায়

পিঠা ঐতিহ্যই নয় একমুঠো অন্নও জোগায়

মাহমুদা ডলি
‘পোলাডার কত আশা ছিল, লেখাপড়া করবো। কিন্তু সামর্থ্য হইলো কই! ধানমন্ডিতে পাইলট স্কুলে ভর্তির জন্য সব কাজগজপত্র ঠিকও করলো, কিন্তু এতগুলো ট্যাকা জমা দিতে পারি নাই।’ আক্ষেপের সঙ্গে কথাগুলো বললেন মোহাম্মদ হাবিল (৪৪)।
নগরীর বসুন্ধরা সিটির পেছনে ফুটপাতে বসে পিঠাপুলি বিক্রি করে রোজগার করেন তিনি। দুই ছেলে, দুই মেয়ের বাবা হাবিল জানান, পিঠাপুলি বিক্রি করে ছেলের রোজগার করা অর্থ দিয়ে ঢাকা শহরে ঘর ভাড়া ও নিত্যদিনের সংসারে খরচ চালাতে হিমশিম খেতে হয়। সাত-আট বছর আগে অভাবের তাড়নায় গ্রামের বাড়ি জামালপুর থেকে ঢাকা আসেন পরিবার পরিজন নিয়ে তিনি। বাধ্য হয়েই অষ্টম শ্রেণীপড়ুয়া ছেলে লিজনকে স্কুল থেকে ছাড়িয়ে ঢাকায় ড্রাইভিংয়ের কাজ দেন।
বর্তমানে দু’জনের আয়ে সংসার চলে। কাঁঠালবাগান এলাকায় ৩ হাজার টাকায় টিনের ঘরে ভাড়া থাকেন তিনি। প্রাথমিক শিক্ষার জন্য দুই ছেলেমেয়েকে স্কুলে দিয়েছেন। কেন এ পেশায়? জানতে চাইলে জানান, প্রথমে নির্মাণ শ্রমিক, তারপর রিকশা চালিয়েছেন। কিন্তু এসব পেশায় বেশিদিন টিকে থাকা যায় না। তাই নিজের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে পিঠা বিক্রি করতে বসেন। অনেক সময় ঋতুর সঙ্গে তাল মিলিয়েও পিঠা তৈরি করেন। যেমন শীতে তৈরি করেন ভাঁপাপিঠা। এছাড়াও সারাবছর চিতইপিঠা, তেলপিঠা তৈরি করেন। প্রতিটি পিঠা ৩ টাকায় বিক্রি করেন। দৈনিক আয় হয় ২ থেকে ৩০০ টাকা। এসব পিঠার বেশিরভাগ ক্রেতাই রিকশাচালক বা শ্রমিক। আবার কখনও কখনও মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্তরাও শখের বশে গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী পিঠার স্বাদ গ্রহণ করেন। বাংলার ঘরে ঘরে অতিথি আপ্যায়ন কিংবা বিয়ে উত্সবে ঐতিহ্য হিসেবে টিকে আছে এসব পিঠাপুলি। আধুনিক হরেক রকম রেস্টুরেস্ট কিংবা ফাস্টফুডের ভিড়ে হারিয়ে যায়নি পিঠা।
আমাদের লোকসাহিত্যে পিঠার স্থান অনেক উঁচু করে দেখানো হয়েছে। কাজল রেখা গীতিকায় চন্দ্রপুলি পিঠা ও ময়মনসিংহের একটি লোকসঙ্গীতে পাকোয়ান পিঠার উল্লেখ রয়েছে। কিন্তু এসব পিঠা এখন গ্রামবাংলার ঐতিহ্যকে ছাড়িয়ে শহরে অর্থ উপার্জনের জন্য একটি বিশেষ পেশা হিসেবে গড়ে উঠেছে। অনেক মানুষ রোজগার করেন পিঠাপুলি তৈরি করে। শুধু ঐতিহ্যই নয়, বর্তমানে হাজারও মানুষের মুখে একমুঠো অন্নও জোগায়। নগরির ফার্মগেট, কারওয়ান বাজার, মিরপুর, রামপুরা, মগবাজারসহ সর্বত্রই পিঠাপুলি বিকিকিনি করতে বসেন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা। তবে এ ধরনের ভ্রাম্যমাণ বা হকারদের রয়েছে নানা হয়রানি। পুলিশ ও এলাকাবাসীর চাঁদাবাজির উত্পাত তো রয়েছেই। তার ফাঁকেও এসব পেশার মাধ্যমে অর্থ উপার্জনের ওপর নির্ভর করছে হাজার হাজার মানুষের ভরণ-পোষণ। কারওয়ান বাজারের হাবিল জানান, ‘পুলিশ যখন আসে তখনই মনটা দুর্বল হইয়া পড়ে। উঠাইয়া দিলে ছেলেপুলে নিয়ে কী খামু!’

Thursday, September 30, 2010

জাগরণীর সাফল্য : তিন হাজারের বেশি নারীর কর্মসংস্থান

জাগরণীর সাফল্য : তিন হাজারের বেশি নারীর কর্মসংস্থান

শাহানাজ পারভীন সুমী
‘জাগরণী জুট হ্যান্ডিক্রাফট্স শপ অ্যান্ড ট্রেনিং সেন্টার’—তেজগাঁওয়ের হলিক্রস স্কুলের বিপরীত পাশে অবস্থিত। জাগরণী’র সৌন্দর্য বর্ধনের বা প্রয়োজনীয় জিনিস যেমন ক্রেতাদের আকৃষ্ট করে, তেমনি এর চারপাশে শান্ত, নির্মল প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ক্রেতাদের মন জুড়িয়ে দেয়।
১৯৭১ সালে যুদ্ধের পরপরই যাত্রা শুরু হয় জাগরণীর। সিস্টার মেরি লিলিয়ানের উদ্যোগে শুরু হয় এর প্রথম পথচলা। শুরুর দিকে একজন বিদেশি উদ্যোক্তাও এর সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন। বর্তমানে শুধু সিস্টার মেরিই আছেন এবং তার তত্ত্বাবধানেই সব কাজ সম্পন্ন হয়। মেরি লিলিয়ান প্রতিষ্ঠানটির ইনচার্জ হিসেবে কর্মরত। এখানে ২০ থেকে শুরু করে আরও বেশি বয়সের নারীরা কাজ করেন। জাগরণীর জন্য প্রায় ৩ হাজারের বেশি মহিলা কর্মী কাজ করেন।
ঢাকা ও এর আশপাশের বিভিন্ন জেলা থেকে পণ্যগুলো এখানে আসে। প্রায় দু’শ’ প্রকারের উপর পণ্য আছে জাগরণীতে। মাটি, কাপড়, পাট, বাঁশ, বেত, বিটস (পুঁথি), চট, মুক্তা, লেদারসহ আরও নানা উপকরণে তৈরি হয় এখানকার পণ্যগুলো। নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস থেকে শুরু করে গৃহসজ্জার এবং সৌন্দর্য বর্ধনের সব জিনিসই এখানে পাওয়া যায়। এমনকি রূপচর্চার নানা প্রসাধনীও পাওয়া যায় এখানে।
পাট দিয়ে তৈরি শিকা, ম্যাট, ব্যাগ ও নানা ধরনের শো-পিস পাওয়া যায় এখানে। মাটি দিয়ে তৈরি বিভিন্ন ধরনের গহনা, কয়েল স্ট্যান্ড, শো-পিস, ল্যাম্প, কলমদানি ইত্যাদি রয়েছে প্রতিষ্ঠানটিতে। এছাড়া লুঙ্গি, শার্ট, সালোয়ার-কামিজ, বাচ্চাদের কাপড়, পাঞ্জাবি, নকশি কাঁথা, টেবিল ক্লথ, বিছানার চাদরসহ সব প্রয়োজনীয় জিনিস এখানে রয়েছে।
পাট ও পাটজাত দ্রব্য থেকে তৈরি জিনিসের মূল্য ৫ টাকা থেকে শুরু করে ৫০/৬০ টাকার মধ্যে পাওয়া যায়। মাটির তৈরি জিনিস এবং গহনা ১০ টাকা থেকে শুরু করে ১০০ টাকার মধ্যে, নকশিকাঁথার বেডকাভার ১২০০ টাকার মধ্যেই পাওয় যায়। বিশেষ করে ক্রেতাদের কাছে এখানকার ফুলের ঝাড়ুর চাহিদা বেশি। ক্রেতাদের কাছে সাজগোজের জিনিসেরও খুব চাহিদা রয়েছে বলে জানালেন এখানে কর্মরত মার্গারেট বাড়ই।
খোঁপার কাঁটা, লেদারের জুয়েলারি বক্স, পার্স, লেডিস ব্যাগ, পাটের জুতা, বাঁশি প্রভৃতি শৌখিন জিনিস এখানে রয়েছে। ঘরের কাজের জিনিস—কাঠের চামচ, ডাল ঘুটনি ইত্যাদিও এখানে পাওয়া যায়। এছাড়া এখানে রয়েছে দৃষ্টিনন্দন বিভিন্ন ধরনের কার্ডের সমাহার, যা ক্রেতাদের আকৃষ্ট করে।
রূপচর্চার জন্য রয়েছে চন্দন ও উপটান। এছাড়া সুতা ও কাপড়ের বালা, চাবির রিং, মোম, ঘি, বই, কাপড়ের পুতুল, মাটির ফুলদানি এখানে পাওয়া যায়। জাগরণীর সুতার কাজ করা ও ব্লকের শাড়ির খুব চাহিদা রয়েছে বলে জানান প্রতিষ্ঠানে কর্মরত অপর একজন।
কাজের সমস্যার কথা জানতে চাইলে মার্গারেট বাড়ই জানান—উপকরণের বেশি দাম বলে সমস্যা হয়।
প্রতিদিন সকাল ৮টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত এবং ৩টা থেকে ৬টা পর্যন্ত খোলা থাকে। রোববার বন্ধ থাকে।

Thursday, April 29, 2010

শহিদুলের ঘটি দই এখন ইউরোপ আমেরিকায়

শহিদুলের ঘটি দই এখন ইউরোপ আমেরিকায়

আরিফুল আবেদীন টিটো, ঝিনাইদহ
ঝিনাইদহের মহেশপুর উপজেলার নিভৃত পল্লী পরাণপুরের ‘ঘটিদই’ এখন দেশের গণ্ডি পেরিয়ে ইউরোপ-আমেরিকায় জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। ব্যতিক্রমধর্মী এই ঘটিদইয়ের উদ্ভাবক ঝিনাইদহের মহেশপুর উপজেলার পরাণপুর গ্রামের শহিদুল ইসলাম। এর উদ্ভাবক হিসেবে তিনি এরই মধ্যে ঝিনাইদহসহ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে ‘ঘটিদই শহিদুল’ নামে পরিচিতি পেয়েছেন। একইসঙ্গে এই পরিণত বয়সে এসে দই ব্যবসার মাধ্যমে স্বাবলম্বীও হয়ে উঠেছেন তিনি।
ঘটিদই আসলে সাধারণ দই-ই, তবে মাটির পাত্রের পরিবর্তে সুদৃশ্য অ্যালুমিনিয়ামের পাত্রে সুস্বাদু এই দই তৈরি করা হয় বলে এ অঞ্চল ছাড়াও দেশব্যাপী এটি ‘ঘটিদই’ নামেই ব্যাপক জনপ্রিয়তা ও পরিচিতি লাভ করেছে।
ঘটিদইয়ের উদ্ভাবক শহিদুল ইসলাম জানালেন, প্রথম জীবনে ১৯৮৮ সালের দিকে তিনি আড়তদারি ব্যবসার সঙ্গে জড়িত হন। ধান, পাট, মসুর ও ছোলাসহ তিনি বিভিন্ন কাঁচামাল কেনাবেচা করতে দেশের নানা প্রান্তে যাওয়া-আসা করতেন। একপর্যায়ে তিনি আড়তদারি ব্যবসায় প্রচুর লোকসান দিয়ে প্রায় নিঃস্ব্ব হয়ে পড়েন। এ অবস্থায় বন্ধু-বান্ধব ও আত্মীয়-স্বজনদের কাছ থেকে টাকা ধার নিয়ে ১৯৯০ সালের দিকে কোটচাঁদপুর শহরে হোটেল ব্যবসা শুরু করেন। ভালোই চলছিল তার হোটেল ব্যবসা। ব্যবসার ফাঁকে ফাঁকে তিনি নিজের হাতে দই ও মিষ্টি বানাতেন। এলাকাবাসী তার হোটেলে তৈরি দইয়ের নাম করায় তিনি দই তৈরির দিকেই ঝুঁকে পড়েন। কিন্তু দুর্ভাগ্য তার। ২০০২ সালে হোটেল ব্যবসাও গুটিয়ে নিতে হয় তাকে। পরে বেশ কয়েক বছর বেকার জীবনযাপন করে ২০০৪ সালের মাঝামাঝি তিনি কোটচাঁদপুর উপজেলার একটি এনজিও থেকে এক লাখ টাকা ঋণ নিয়ে মহেশপুর উপজেলার পরাণপুর গ্রামের নিভৃত পল্লীতে নিজের দীর্ঘজীবনের হোটেল ব্যবসার অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে ব্যতিক্রমধর্মী ঘটিদইয়ের বাণিজ্যিক উত্পাদন শুরু করেন। এরপর আর তাকে পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি।
শহিদুল জানান, পরাণপুর এলাকার গরুর মালিকদের বাড়ি থেকে ঘটিদইয়ের জন্য প্রতিকেজি ৩০ টাকা করে খাঁটি দুধ সংগ্রহ করা হয়। তারপর বড় বড় কড়াইয়ে ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা ধরে দুধ জাল দিয়ে কেবল চিনি মিশিয়ে সুস্বাদু সরের ঘটিদই তৈরি করা হয়। এই দই তিনি পাইকারদের কাছে ৮৫ টাকা কেজি দরে বিক্রি করেন। এরপর এই ঘটিদই মহেশপুর, কোটচাঁদপুর, জীবননগর, চৌগাছাসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় ৯০ থেকে ৯৫ টাকা কেজি দরে বিক্রি হয়।
ঘটিদইয়ের উদ্ভাবক শহিদুল ইসলামের মহেশপুরের পরাণপুরের কারখানায় প্রায় ৩০ জন শ্রমিক প্রতিদিন কাজ করছেন। এ কারখানায় ৬-৭ লাখ টাকা পুঁজি বিনিয়োগ করতে হয়েছে। এ টাকার পুরোটাই বিভিন্ন এনজিও ও ব্যাংক থেকে পাওয়া ঋণ। সব খরচ বাদ দিয়ে প্রতিমাসে তার ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকা আয় হয়। তিনি আরও জানালেন, প্রায় প্রতিদিনই তার উত্পাদিত দই মানুষ কারখানা থেকে কিনে নিয়ে বিদেশে তাদের আত্মীয়স্বজনদের কাছে পাঠাচ্ছেন। এরই মধ্যে ঘটিদই আমেরিকা, সৌদি আরব, দুবাই, কানাডা, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, ইতালি, রাশিয়া ও ভারতের মানুষের কাছে পৌঁছে গেছে। আমেরিকার নিউইয়র্ক সিটির বাঙালি কম্যুনিটিতে তার ঘটিদইয়ের ব্যাপক জনপ্রিয়তা দেখা দিয়েছে। সম্প্রতি নিউইয়র্ক সিটির এক বাঙালি ব্যবসায়ী তাকে বাণিজ্যিকভাবে ঘটিদই রফতানির প্রস্তাব দিয়েছেন। তবে পর্যাপ্ত অর্থের অভাবে শহিদুল দই রফতানি করতে পারছেন না বলে আক্ষেপ প্রকাশ করলেন। সরকারি সাহায্য-সহযোগিতা পেলে আরও ব্যাপক ভিত্তিতে ঘটিদই উত্পাদন করে বিদেশে রফতানির মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা সম্ভব বলে জানালেন তিনি।